Hi

১১:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিভ্রান্তি বনাম ইতিহাস: হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া কি আসলেই ডাকাত ছিলেন?

আমাদের লোকসমাজে একটি বহুল প্রচলিত লোকগল্প রয়েছে যে, বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া তাঁর জীবনের শুরুর দিকে ডাকাত ছিলেন এবং তিনি প্রায় একশতটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। তবে ঐতিহাসিক তথ্য, নির্ভরযোগ্য দলিল এবং প্রাচীন গ্রন্থাদি বিশ্লেষণ করলে এই দাবির কোনো সত্যতা বা ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক কোন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতায় এই কাল্পনিক কাহিনীর জন্ম ও প্রচার হয়েছিল, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। তবে প্রকৃত সত্য হলো, দিল্লির প্রখ্যাত সুফি সাধক সুলতানুল মাশায়েখ হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া (১২৩৮-১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) কখনোই দস্যুবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বরং শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন।

ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে রচিত ফারসি ভাষার নির্ভরযোগ্য আদি গ্রন্থ যেমন—‘ফাওয়ায়েদ আল ফাওয়াদ’, ‘আফজাল আল ফাওয়ায়েদ’ এবং ‘সিয়ার আল আউলিয়া’ থেকে তাঁর জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত ও তথ্যসমৃদ্ধ বিবরণ পাওয়া যায়। এসব গ্রন্থ অনুসারে, খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বংশগতভাবে নবী করিম (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বংশধর ছিলেন। মঙ্গোলদের আক্রমণের উত্তাল সময়ে তাঁর পূর্বপুরুষ খাজা আলী বোখারা থেকে লাহোর হয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদাউনে এসে বসতি স্থাপন করেন। শৈশবেই তাঁর পিতা খাজা সৈয়দ আহমদ ইন্তেকাল করলে তাঁর মাতা সৈয়দা বিবি জুলাইখা অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে তাঁকে বড় করে তোলেন। চরকায় সুতা কেটে তা বিক্রির মাধ্যমে কোনোমতে সংসার পরিচালনা করার পাশাপাশি তিনি পুত্রের সুশিক্ষা নিশ্চিত করেন।

১৬ বছর বয়স পর্যন্ত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বাদাউনে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন এবং অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তকারীকে ‘দানেশমান্দ’ বা জ্ঞানী বলা হতো এবং সম্মানসূচক পাগড়ি বা দস্তারবন্দী পরানো হতো। বাদাউনের বিখ্যাত সুফি শায়খ খাজা আলী তাঁকে নিজ হাতে এই পাগড়ি পরিয়ে দেন। এই বিশেষ পাগড়িটি তাঁর মা সৈয়দা বিবি জুলাইখা নিজে চরকায় সুতা কেটে তৈরি করেছিলেন। বাদাউনে থাকাকালে তিনি সে যুগের প্রখ্যাত পণ্ডিত মাওলানা আলাউদ্দিন উসুলির অধীনে অভিধানশাস্ত্র বা ‘লুগাত’ সহ বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

বাদাউনের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর মা ও বোনকে নিয়ে তৎকালীন রাজধানী দিল্লিতে চলে আসেন। দিল্লিতে এসে মাওলানা কামালউদ্দিন জাহেদের অধীনে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং সমগ্র ‘মাশারেক্ব আল আনওয়ার’ গ্রন্থটি মুখস্থ করে হাদিস পাঠদানের অনুমতি লাভ করেন। এরপর তিনি ‘শামসুল ওলামা’ মাওলানা শামসউদ্দিনের অধীনে সাহিত্যের পাঠ নেন। তাঁর অসাধারণ মেধা, বাগ্মিতা ও প্রখর স্মৃতির কারণে তিনি সমসাময়িক পণ্ডিতদের মাঝে ‘নিজামউদ্দিন বাহহাস’ (বিতার্কিক) এবং ‘মাহফিল শিকন’ উপাধিতে ভূষিত হন।

কাজী বা বিচারক হওয়ার লক্ষ্যে দিল্লির প্রখ্যাত সুফি হজরত খাজা নজিবউদ্দিন মুতাওয়াক্কেলের কাছে দোয়া চাইতে গেলে তিনি খাজা নিজামউদ্দিনকে বিচারকের পরিবর্তে আধ্যাত্মিকতার পথ অনুসরণের পরামর্শ দেন। খাজা নজিবউদ্দিন তাঁকে চিশতিয়া তরিকার প্রধান স্তম্ভ বাবা ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জে শকরের সান্নিধ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মায়ের অনুমতি নিয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি আজোধানে (বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের পাকপাত্তান) বাবা ফরিদের দরবারে গমন করেন। বাবা ফরিদের কাছে বায়াত গ্রহণ করার পর তিনি অত্যন্ত দ্রুত আধ্যাত্মিক সাধনার উচ্চ শিখরে আরোহণ করেন এবং চিশতিয়া তরিকার প্রধান খলিফা হিসেবে মনোনীত হন।

বাবা ফরিদের কাছ থেকে খেলাফত লাভের পর তিনি দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং গিয়াসপুর নামক একটি উপশহরে নিজের খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে চিশতিয়া তরিকার পীর হিসেবে তাঁর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা দীর্ঘ ৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। সারা জীবন তিনি আধ্যাত্মিক শিক্ষা, মানবসেবা ও ইসলামের অহিংস মানবিক বাণী প্রচার করে গেছেন। সুতরাং, লোকমুখে প্রচলিত ডাকাত হওয়ার গল্পটি ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা মাত্র।

জনপ্রিয়

নীলফামারীতে সাপে কাটা যুবককে ঝাড়ফুঁকে জীবিত করার চেষ্টা, এলাকায় চাঞ্চল্য

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

বিভ্রান্তি বনাম ইতিহাস: হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া কি আসলেই ডাকাত ছিলেন?

আপডেট : ১০:০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

আমাদের লোকসমাজে একটি বহুল প্রচলিত লোকগল্প রয়েছে যে, বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া তাঁর জীবনের শুরুর দিকে ডাকাত ছিলেন এবং তিনি প্রায় একশতটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। তবে ঐতিহাসিক তথ্য, নির্ভরযোগ্য দলিল এবং প্রাচীন গ্রন্থাদি বিশ্লেষণ করলে এই দাবির কোনো সত্যতা বা ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক কোন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতায় এই কাল্পনিক কাহিনীর জন্ম ও প্রচার হয়েছিল, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। তবে প্রকৃত সত্য হলো, দিল্লির প্রখ্যাত সুফি সাধক সুলতানুল মাশায়েখ হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া (১২৩৮-১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) কখনোই দস্যুবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বরং শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন।

ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে রচিত ফারসি ভাষার নির্ভরযোগ্য আদি গ্রন্থ যেমন—‘ফাওয়ায়েদ আল ফাওয়াদ’, ‘আফজাল আল ফাওয়ায়েদ’ এবং ‘সিয়ার আল আউলিয়া’ থেকে তাঁর জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত ও তথ্যসমৃদ্ধ বিবরণ পাওয়া যায়। এসব গ্রন্থ অনুসারে, খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বংশগতভাবে নবী করিম (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বংশধর ছিলেন। মঙ্গোলদের আক্রমণের উত্তাল সময়ে তাঁর পূর্বপুরুষ খাজা আলী বোখারা থেকে লাহোর হয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদাউনে এসে বসতি স্থাপন করেন। শৈশবেই তাঁর পিতা খাজা সৈয়দ আহমদ ইন্তেকাল করলে তাঁর মাতা সৈয়দা বিবি জুলাইখা অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে তাঁকে বড় করে তোলেন। চরকায় সুতা কেটে তা বিক্রির মাধ্যমে কোনোমতে সংসার পরিচালনা করার পাশাপাশি তিনি পুত্রের সুশিক্ষা নিশ্চিত করেন।

১৬ বছর বয়স পর্যন্ত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বাদাউনে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন এবং অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তকারীকে ‘দানেশমান্দ’ বা জ্ঞানী বলা হতো এবং সম্মানসূচক পাগড়ি বা দস্তারবন্দী পরানো হতো। বাদাউনের বিখ্যাত সুফি শায়খ খাজা আলী তাঁকে নিজ হাতে এই পাগড়ি পরিয়ে দেন। এই বিশেষ পাগড়িটি তাঁর মা সৈয়দা বিবি জুলাইখা নিজে চরকায় সুতা কেটে তৈরি করেছিলেন। বাদাউনে থাকাকালে তিনি সে যুগের প্রখ্যাত পণ্ডিত মাওলানা আলাউদ্দিন উসুলির অধীনে অভিধানশাস্ত্র বা ‘লুগাত’ সহ বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

বাদাউনের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর মা ও বোনকে নিয়ে তৎকালীন রাজধানী দিল্লিতে চলে আসেন। দিল্লিতে এসে মাওলানা কামালউদ্দিন জাহেদের অধীনে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং সমগ্র ‘মাশারেক্ব আল আনওয়ার’ গ্রন্থটি মুখস্থ করে হাদিস পাঠদানের অনুমতি লাভ করেন। এরপর তিনি ‘শামসুল ওলামা’ মাওলানা শামসউদ্দিনের অধীনে সাহিত্যের পাঠ নেন। তাঁর অসাধারণ মেধা, বাগ্মিতা ও প্রখর স্মৃতির কারণে তিনি সমসাময়িক পণ্ডিতদের মাঝে ‘নিজামউদ্দিন বাহহাস’ (বিতার্কিক) এবং ‘মাহফিল শিকন’ উপাধিতে ভূষিত হন।

কাজী বা বিচারক হওয়ার লক্ষ্যে দিল্লির প্রখ্যাত সুফি হজরত খাজা নজিবউদ্দিন মুতাওয়াক্কেলের কাছে দোয়া চাইতে গেলে তিনি খাজা নিজামউদ্দিনকে বিচারকের পরিবর্তে আধ্যাত্মিকতার পথ অনুসরণের পরামর্শ দেন। খাজা নজিবউদ্দিন তাঁকে চিশতিয়া তরিকার প্রধান স্তম্ভ বাবা ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জে শকরের সান্নিধ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেন। মায়ের অনুমতি নিয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি আজোধানে (বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের পাকপাত্তান) বাবা ফরিদের দরবারে গমন করেন। বাবা ফরিদের কাছে বায়াত গ্রহণ করার পর তিনি অত্যন্ত দ্রুত আধ্যাত্মিক সাধনার উচ্চ শিখরে আরোহণ করেন এবং চিশতিয়া তরিকার প্রধান খলিফা হিসেবে মনোনীত হন।

বাবা ফরিদের কাছ থেকে খেলাফত লাভের পর তিনি দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং গিয়াসপুর নামক একটি উপশহরে নিজের খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে চিশতিয়া তরিকার পীর হিসেবে তাঁর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা দীর্ঘ ৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। সারা জীবন তিনি আধ্যাত্মিক শিক্ষা, মানবসেবা ও ইসলামের অহিংস মানবিক বাণী প্রচার করে গেছেন। সুতরাং, লোকমুখে প্রচলিত ডাকাত হওয়ার গল্পটি ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা মাত্র।