ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, পার্থিব জীবন মূলত এক ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষা ক্ষেত্র, যার মূল উদ্দেশ্য হলো মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন এবং চিরশান্তির আবাস জান্নাত লাভ করা। প্রতিটি মুমিনের জীবনে পরম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হলো পরকালের এই মহাসফল্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম উম্মাহকে এমন কিছু সহজ অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আমল ও দোয়া শিখিয়েছেন, যা নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে জান্নাতের পথ সুগম করা সম্ভব। এর মধ্যে একটি বিশেষ দোয়ার কথা হাদিসে বিশেষভাবে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে, যা কেবল উচ্চারণে সহজ নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত দর্শন অত্যন্ত গভীর ও হৃদয়গ্রাহী।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি নির্ভরযোগ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে পাঠ করবে, “রজীতু বিল্লাহি রব্বান, ওয়া বিল-ইসলামি দীনান, ওয়া বি-মুহাম্মাদিন রসূলান” (অর্থাৎ: আমি সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহকে আমার প্রতিপালক, ইসলামকে আমার জীবনবিধান বা ধর্ম এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমার রাসুল হিসেবে গ্রহণ করেছি)—তার জন্য জান্নাত অবধারিত বা সুনিশ্চিত হয়ে যায়। সুনানে আবু দাউদের ১৫২৯ নম্বর হাদিসে এই ঘোষণা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই দোয়াটির মাধ্যমে একজন মুসলিম তার ইমানের মূল ভিত্তিগুলোকে পুনরায় স্বীকার করেন এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞ আলেমরা মনে করেন, এই ছোট্ট দোয়ার পেছনে কোনো প্রকার বিপুল সম্পদের ব্যয়, কঠোর শারীরিক সাধনা বা উচ্চ সামাজিক মর্যাদার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়নি। মহানবী (সা.) এখানে কেবল মনের গভীর বিশ্বাস, আন্তরিক একনিষ্ঠতা এবং ঐশ্বরিক সিদ্ধান্তের প্রতি পরম সন্তুষ্টির শর্তারোপ করেছেন। এই দোয়াটির গভীরে নিহিত রয়েছে ইসলামের তিনটি প্রধান মূলস্তম্ভ বা মূলদর্শন:
প্রথমত, আল্লাহকে প্রতিপালক বা ‘রব’ হিসেবে মেনে নেওয়া। এর বাস্তব অর্থ হলো, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সৃষ্টিকর্তার ফয়সালা, হেদায়েত এবং তাকদিরের ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। জীবনে নেমে আসা দুঃখ-কষ্ট বা চরম পরীক্ষার মুহূর্তেও অভিযোগ না করে আল্লাহর অসীম করুণার প্রতি অবিচল আস্থা রাখাই হলো আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ‘রব’ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রকৃত নিদর্শন।
দ্বিতীয়ত, ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা। ইসলাম কেবল মাত্র কিছু আনুষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি দিকের দিকনির্দেশনা। আনন্দ-বেদনার সব ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম-কানুনগুলোকে সানন্দে নিজের জীবনে ধারণ করার মাধ্যমেই এই সন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
তৃতীয়ত, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল হিসেবে হৃদয়ে স্থান দেওয়া। নবীজির প্রদর্শিত পথই যে মানবজীবনের চূড়ান্ত মুক্তির একমাত্র উপায়, তা দ্বিধাহীনভাবে বিশ্বাস করা এবং তাঁর সুন্নাহকে নিজের প্রাত্যহিক আচরণে প্রতিফলিত করার মাধ্যমে মুমিনগণ এক বিশেষ আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেন।
হাদিস বিশারদগণের মতে, এই অমূল্য দোয়াটি পাঠ করার জন্য বিশেষ কিছু বরকতময় সময় রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিদিন আজান শোনার পর এই দোয়াটি পাঠ করলে অতীতের গুনাহ মাফ হওয়ার বিশেষ সুসংবাদ রয়েছে, যা সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এছাড়া, সকাল এবং সন্ধ্যার প্রাত্যহিক জিকিরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই দোয়া তিনবার পাঠ করার পরম ফজিলত রয়েছে। সুনানে আবু দাউদের অন্য একটি হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার এই বাক্যগুলো উচ্চারণ করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সন্তুষ্ট করা স্বয়ং আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। অতএব, প্রতিদিনের রুটিনে সকালের শুরুতে ও সন্ধ্যার প্রাক্কালে, আজানের মধ্যবর্তী সময়ে কিংবা দোয়া কবুলের অন্যান্য পবিত্র মুহূর্তে এই আমলটি নিয়মিত চর্চা করার মাধ্যমে মুমিনগণ দুনিয়া ও আখিরাতের অফুরন্ত কল্যাণ লাভ করতে পারেন।
রিপোর্টার নাম: 
























