Hi

১২:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বীনা স্মৃতি ঘাটে সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপার চিরতরে বন্ধ

রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বীনা স্মৃতি স্নানঘাট দিয়ে সব ধরনের সাধারণ মানুষ এবং পণ্য পারাপার চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মিশ্র ব্যবহারের ফলে এই পবিত্র স্থানটির ধর্মীয় পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হচ্ছিল বলে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানিয়ে আসা হচ্ছিল। অবশেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে ঘাটটিকে তার মূল উদ্দেশ্য তথা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শেষকৃত্য সম্পাদনের জন্য উন্মুক্ত রাখার পথ সুগম হলো।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এক বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই পারাপার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হবে। জানা গেছে, কোতোয়ালি থানা পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্টের শীর্ষ স্থানীয় নেতা, ঘাটের বর্তমান ইজারাদার এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে বিআইডব্লিউটিএ এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে। এর ফলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটটি আর কখনোই সাধারণ ট্রলার বা গোদারা ঘাট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না সাধারণ মানুষ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০২ সালের দিকে তৎকালীন ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রিয় কমিশনার ও স্থানীয় নেতা বিনয় সরকার বীনা সন্ত্রাসীদের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান। তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে বুড়িগঙ্গার তীরে এই স্নানঘাটটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সময় পরিক্রমায় এটি পুরান ঢাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে কারো মৃত্যুসংবাদ পেলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা এই ঘাটে এসে শেষকৃত্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে থাকেন।

তবে ২০০৯ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর পটপরিবর্তন ঘটে এই ঘাটের ব্যবস্থাপনায়ও। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সে সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে ধর্মীয় এই স্নানঘাটটিকে জোরপূর্বক সাধারণ যাত্রী ও পণ্য পারাপারের ঘাটে রূপান্তর করা হয়। ফলে অন্যান্য ব্যস্ত বাণিজ্যিক ঘাটের মতো এখানেও দিনভর মানুষের ভিড় এবং নৌকার আসা-যাওয়া শুরু হয়। এর ফলে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের প্রিয়জনদের শেষকৃত্য ও অন্যান্য পবিত্র ধর্মীয় আচার পালনের সময় চরম মানবেতর পরিস্থিতির মুখে পড়তেন। চারপাশের কোলাহল এবং মানুষের আনাগোনা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

কোতোয়ালি থানা পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্টের সভাপতি শংকর সেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু নেতার আপসকামিতার কারণে এই পবিত্র স্থানের অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির পর বর্তমান প্রশাসনের বোধোদয় হয়েছে। সাধারণ মানুষের পারাপার বন্ধ হওয়ায় এখন থেকে স্বজন হারানো মানুষেরা কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই শান্তিতে এবং ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারবেন।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে আরও জানা গেছে, বীনা স্মৃতি স্নানঘাটটি কখনো আলাদাভাবে ইজারা দেওয়া হতো না। বুড়িগঙ্গার ওপারে অবস্থিত কেরানীগঞ্জের আলম মার্কেট ঘাট থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীরা সরাসরি এই ঘাটে ভিড়ত। তবে বর্তমান জটিলতা নিরসনে নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের পরিদর্শনের সময় বীনা স্মৃতি ঘাটের পাশ থেকে ১২০ ফুট দীর্ঘ সিঁড়িযুক্ত একটি ভারী পন্টুন সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যেই সেই পন্টুনটি নিরাপদ দূরত্বে ওয়াইজঘাটের পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের এই সুচিন্তিত পদক্ষেপে একদিকে যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও দাবির অবসান ঘটল, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদের পারাপারেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি পোহাতে হবে না। কারণ মূল স্নানঘাটটি সংরক্ষিত থাকলেও এর পাশেই বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পারাপার অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধাবোধ আরও সুদৃঢ় হবে এবং ঐতিহাসিক এই স্থানটির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সহজ করলেও তা টেকসই করতে ব্যর্থ হচ্ছে: অধ্যাপক ফাহমিদুল হক

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বীনা স্মৃতি ঘাটে সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপার চিরতরে বন্ধ

আপডেট : ১১:৪৫:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বীনা স্মৃতি স্নানঘাট দিয়ে সব ধরনের সাধারণ মানুষ এবং পণ্য পারাপার চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মিশ্র ব্যবহারের ফলে এই পবিত্র স্থানটির ধর্মীয় পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হচ্ছিল বলে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানিয়ে আসা হচ্ছিল। অবশেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে ঘাটটিকে তার মূল উদ্দেশ্য তথা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শেষকৃত্য সম্পাদনের জন্য উন্মুক্ত রাখার পথ সুগম হলো।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এক বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই পারাপার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হবে। জানা গেছে, কোতোয়ালি থানা পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্টের শীর্ষ স্থানীয় নেতা, ঘাটের বর্তমান ইজারাদার এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে বিআইডব্লিউটিএ এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে। এর ফলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটটি আর কখনোই সাধারণ ট্রলার বা গোদারা ঘাট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না সাধারণ মানুষ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০২ সালের দিকে তৎকালীন ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রিয় কমিশনার ও স্থানীয় নেতা বিনয় সরকার বীনা সন্ত্রাসীদের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান। তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে বুড়িগঙ্গার তীরে এই স্নানঘাটটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সময় পরিক্রমায় এটি পুরান ঢাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে কারো মৃত্যুসংবাদ পেলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা এই ঘাটে এসে শেষকৃত্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে থাকেন।

তবে ২০০৯ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর পটপরিবর্তন ঘটে এই ঘাটের ব্যবস্থাপনায়ও। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সে সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে ধর্মীয় এই স্নানঘাটটিকে জোরপূর্বক সাধারণ যাত্রী ও পণ্য পারাপারের ঘাটে রূপান্তর করা হয়। ফলে অন্যান্য ব্যস্ত বাণিজ্যিক ঘাটের মতো এখানেও দিনভর মানুষের ভিড় এবং নৌকার আসা-যাওয়া শুরু হয়। এর ফলে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের প্রিয়জনদের শেষকৃত্য ও অন্যান্য পবিত্র ধর্মীয় আচার পালনের সময় চরম মানবেতর পরিস্থিতির মুখে পড়তেন। চারপাশের কোলাহল এবং মানুষের আনাগোনা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

কোতোয়ালি থানা পূজা উদ্‌যাপন ফ্রন্টের সভাপতি শংকর সেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু নেতার আপসকামিতার কারণে এই পবিত্র স্থানের অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ আন্দোলন ও দাবির পর বর্তমান প্রশাসনের বোধোদয় হয়েছে। সাধারণ মানুষের পারাপার বন্ধ হওয়ায় এখন থেকে স্বজন হারানো মানুষেরা কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই শান্তিতে এবং ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারবেন।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে আরও জানা গেছে, বীনা স্মৃতি স্নানঘাটটি কখনো আলাদাভাবে ইজারা দেওয়া হতো না। বুড়িগঙ্গার ওপারে অবস্থিত কেরানীগঞ্জের আলম মার্কেট ঘাট থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীরা সরাসরি এই ঘাটে ভিড়ত। তবে বর্তমান জটিলতা নিরসনে নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের পরিদর্শনের সময় বীনা স্মৃতি ঘাটের পাশ থেকে ১২০ ফুট দীর্ঘ সিঁড়িযুক্ত একটি ভারী পন্টুন সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যেই সেই পন্টুনটি নিরাপদ দূরত্বে ওয়াইজঘাটের পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের এই সুচিন্তিত পদক্ষেপে একদিকে যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও দাবির অবসান ঘটল, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদের পারাপারেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি পোহাতে হবে না। কারণ মূল স্নানঘাটটি সংরক্ষিত থাকলেও এর পাশেই বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পারাপার অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধাবোধ আরও সুদৃঢ় হবে এবং ঐতিহাসিক এই স্থানটির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।