জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির অনুপস্থিতির কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত এক এসডিজি বিষয়ক সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বক্তারা জানান, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব এবং জন্মনিবন্ধনের জটিলতার কারণে ছিন্নমূল মানুষ, তৃতীয় লিঙ্গ এবং মান্তা সম্প্রদায়ের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিকরা এনআইডি কার্ড হাতে পাচ্ছেন না। এর ফলে তাঁরা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমূলক সেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত থাকছেন।
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই এসডিজি সম্মেলনের সমাপনী দিনে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার ও উন্নয়নে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো শীর্ষক একটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) এবং নাগরিক প্ল্যাটফর্মের যৌথ উদ্যোগে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম ও বঞ্চনার করুণ চিত্র তুলে ধরেন।
সম্মেলনে অংশ নিয়ে মিরপুরের মাজার রোড এলাকার ভ্যানচালক ও স্থানীয় প্রতিনিধি মোড়ো ওয়াসিম জানান, এলাকার বহু ছিন্নমূল মানুষের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। একইভাবে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি রামিসা চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের এনআইডি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের আমলাতান্ত্রিক ও সামাজিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অন্যদিকে, বরিশлаলের অবহেলিত মান্তা সম্প্রদায়ের তরুণ প্রতিনিধি সোহানুর রহমান অভিযোগ করেন, তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষেরা নাগরিক পরিচয়ের এই মৌলিক দলিল থেকে বঞ্চিত থাকায় সরকারের কোনো সাহায্যই তাঁদের পর্যন্ত পৌঁছায় না।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধান সোপান হলো জাতীয় পরিচয়পত্র। প্রবৃদ্ধির উচ্চ হারের খতিয়ান দেখলেই চলবে না, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোর গুণগত মান এবং বৈষম্যের হার কতখানি বাড়ছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বাস্তবতায় প্রতি তিনজন শিক্ষিত যুবকের মধ্যে অন্তত একজন বেকার রয়েছেন এবং দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি শ্লথ হয়ে বৈষম্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্মানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন স্বীকার করেন যে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নে বিশ্ব সূচকে বাংলাদেশ বর্তমানে ১১০তম অবস্থানে রয়েছে। হাতে সময় পাঁচ বছরেরও কম থাকায় এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে কাজের গতি বহুগুণ বাড়াতে হবে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার বৈষম্যহীন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, সাধারণ মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। রাষ্ট্রযন্ত্র পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী নীতিনির্ধারক ও সংসদ সদস্যরা প্রান্তিক মানুষের এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন এবং জন্মনিবন্ধনের জট কমিয়ে এনআইডি প্রাপ্তি সহজ করার ওপর বিশেষ জোর দেন।
রিপোর্টার নাম: 
























