বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের নীতিগত পদক্ষেপে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পুরোনো ধারার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে, যার ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। বিগত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘জবের বন্যা’ ও ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগের যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা পূরণ হয়নি। এর পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, জ্বালানি সংকট, এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রধান ভূমিকা রাখছে। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক বৈশ্বিক সংকটের জেরে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে দেশের অনেক চালু শিল্পকারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। নতুন শিল্প স্থাপন তো দূরের কথা, বিদ্যমান কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখাই উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের পতন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংকোচন সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও বেশি সংকুচিত করেছে।
অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে সরকার কিছু নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বেজা এবং পিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, যার লক্ষ্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার কমানো এবং বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্প সচল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে ঋণদাতা ব্যাংকের শর্ত এবং জ্বালানি নিশ্চয়তার অভাবে অনেক উদ্যোক্তা প্রণোদনার সুবিধা নিতে সাহস পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া বা পিপিপি মডেলে পরিচালনার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পাট ও চিনি কলের মতো খাতগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বদলে ঢালাও বেসরকারীকরণের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে সবকিছু ছেড়ে দিলেই সুফল মিলবে—এমন ধারণা সঠিক নয়, কারণ এতে অনেক সময় জনকল্যাণ ও ভোক্তা অধিকার হুমকির মুখে পড়ে।
জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণ এবং নীতিমালা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েও তৈরি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক। অতীতে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যে ক্যাপাসিটি চার্জের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারীকরণের উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর বদলে অফশোর বিডিংয়ে বিদেশি কোম্পানির জন্য শর্ত আরও শিথিল করা এবং তেল আমদানিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উন্মুক্ত করার নীতি অর্থনীতির কৌশলগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে, অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে একক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা অতীতে এলপিজি খাতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে। এছাড়াও, বড় বড় মেগা প্রকল্প যেমন মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল বা মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও লজিস্টিকস সুবিধা নিশ্চিত না করে একের পর এক নতুন প্রকল্প গ্রহণ করায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা মনে করেন, কেবল খণ্ডিত বা ইনক্রিমেন্টাল নীতি দিয়ে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান বাড়াতে এবং রুগ্ণ শিল্প রক্ষা করতে হলে ঢালাও বেসরকারীকরণের পথ থেকে সরে এসে জ্বালানি ও শিল্পখাতে একটি সুসংহত ও সুদূর প্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি, নতুবা বেকারত্ব ও খেলাপি ঋণের বোঝা আরও ভারী হবে।
রিপোর্টার নাম: 






















