Hi

০৭:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলনে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে পারদদূষণ, ঝুঁকিতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য

বিশ্বের অন্যতম দুর্গম ও বরফাবৃত মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় মানুষের চোখ এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমা হওয়া বিষাক্ত পারদ এখন গলিত বরফের স্রোতে মহাসাগরে মিশে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই মেরু অঞ্চলের বরফের আস্তরণ দ্রুত গলে যাচ্ছে, যার ফলে প্রাচীন আমলের এই ভারী ধাতু উন্মুক্ত হচ্ছে। মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। চীনের পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী চেংঝেন ঝোয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় মহীসোপান এলাকার পলি পরীক্ষা করে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্পায়নের শুরু অর্থাৎ ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে পারদ জমার মাত্রা প্রায় ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এই মহাদেশটি মানববসতি ও কলকারখানা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। মূলত বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের মাধ্যমে শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট পারদ বাষ্প বা কণারূপে দূর-দূরান্ত থেকে বায়ুমণ্ডলে এসে পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে বরফ ও সাগরের পানিতে শোষিত হয়। অতীতে বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘বায়ুমণ্ডল-সমুদ্রচক্র’ হিসেবে অভিহিত করলেও, বর্তমানে বরফ গলা ও ভূমিক্ষয়ের কারণে একটি জটিল চক্র বা ‘বায়ুমণ্ডল-হিমবাহ-স্থলভাগ-সমুদ্রচক্র’ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বরফের নিচে আবদ্ধ থাকা পারদ এখন অবাধে সমুদ্রের পানিতে মিশে যাচ্ছে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যান্টার্কটিকা দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক উপায়ে পারদের একটি বিশাল আধার হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে সেই আধার এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। অ্যান্টার্কটিকার বরফ যত দ্রুত গলছে, ততই সেখানে জমে থাকা পুরোনো ও বিষাক্ত পারদ আশপাশের সাগরের পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে সামুদ্রিক প্রাণীদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অ্যান্টার্কটিক টুথফিশ, মার্লিন এবং বিভিন্ন প্রজাতির হাঙরের শরীরে পারদের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পারদ মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি রাসায়নিক উপাদান, যা সামান্য পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করলেও মারাত্মক বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। অ্যান্টার্কটিকার মতো প্রাচীন মেরু অঞ্চল থেকে এই বিষাক্ত উপাদান বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের স্রোতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাস্তুতন্ত্র ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, অবিলম্বে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এই পারদদূষণ গোটা পৃথিবীর সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

জনপ্রিয়

আঙ্কারায় ট্রাম্পের বিমান ঘিরে নাটকীয় নিরাপত্তা আতঙ্ক: নেপথ্যে কি ইসরায়েলি গোয়েন্দা কৌশল?

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলনে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে পারদদূষণ, ঝুঁকিতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য

আপডেট : ০৫:৪৪:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বের অন্যতম দুর্গম ও বরফাবৃত মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় মানুষের চোখ এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমা হওয়া বিষাক্ত পারদ এখন গলিত বরফের স্রোতে মহাসাগরে মিশে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই মেরু অঞ্চলের বরফের আস্তরণ দ্রুত গলে যাচ্ছে, যার ফলে প্রাচীন আমলের এই ভারী ধাতু উন্মুক্ত হচ্ছে। মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। চীনের পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী চেংঝেন ঝোয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় মহীসোপান এলাকার পলি পরীক্ষা করে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্পায়নের শুরু অর্থাৎ ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে পারদ জমার মাত্রা প্রায় ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এই মহাদেশটি মানববসতি ও কলকারখানা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। মূলত বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের মাধ্যমে শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট পারদ বাষ্প বা কণারূপে দূর-দূরান্ত থেকে বায়ুমণ্ডলে এসে পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে বরফ ও সাগরের পানিতে শোষিত হয়। অতীতে বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘বায়ুমণ্ডল-সমুদ্রচক্র’ হিসেবে অভিহিত করলেও, বর্তমানে বরফ গলা ও ভূমিক্ষয়ের কারণে একটি জটিল চক্র বা ‘বায়ুমণ্ডল-হিমবাহ-স্থলভাগ-সমুদ্রচক্র’ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বরফের নিচে আবদ্ধ থাকা পারদ এখন অবাধে সমুদ্রের পানিতে মিশে যাচ্ছে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যান্টার্কটিকা দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক উপায়ে পারদের একটি বিশাল আধার হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে সেই আধার এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। অ্যান্টার্কটিকার বরফ যত দ্রুত গলছে, ততই সেখানে জমে থাকা পুরোনো ও বিষাক্ত পারদ আশপাশের সাগরের পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে সামুদ্রিক প্রাণীদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অ্যান্টার্কটিক টুথফিশ, মার্লিন এবং বিভিন্ন প্রজাতির হাঙরের শরীরে পারদের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পারদ মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি রাসায়নিক উপাদান, যা সামান্য পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করলেও মারাত্মক বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। অ্যান্টার্কটিকার মতো প্রাচীন মেরু অঞ্চল থেকে এই বিষাক্ত উপাদান বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের স্রোতের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাস্তুতন্ত্র ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, অবিলম্বে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এই পারদদূষণ গোটা পৃথিবীর সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।