Hi

১২:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এসএসসি পাসের আনন্দ নিমিষেই বিষাদে: ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়ায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল মেধাবী সোনালীর

পাবনার বেড়া উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিন পর বিষধর সাপের কামড়ে সোনালী আক্তার (১৬) নামের এক মেধাবী কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার ঢালারচর ইউনিয়নের দুর্গম চর মিরপুর গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। দরিদ্র পরিবারের এই অকাল প্রয়াণে গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশেষ করে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথার হয়ে গেছেন তাঁর মা রাশেদা খাতুন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোনালীর জন্মের আগেই বা শৈশবেই তার বাবা মারা যান। এরপর রাশেদা খাতুন তাঁর আরেক মেয়ের মৃত্যুর শোক সহ্য করে সোনালীকে নিয়ে পাবনার বেড়ার চর মিরপুর গ্রামে তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও একমাত্র মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়ে বড় করছিলেন তিনি। মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেই তিনি আর দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। সোনালীও মায়ের সেই ত্যাগের মূল্য দিতে প্রাণপণ পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় ‘সিনথী পাঠশালা’ থেকে চলতি বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ ৩.৫৬ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়।

গত রবিবার পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই পরিবারটিতে আনন্দের জোয়ার বইছিল। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই নেমে আসে কালরাত। মঙ্গলবার রাতে মায়ের সঙ্গে পাশের একটি বাড়ি থেকে নিজের ঘরে ফেরার পথে সোনালীকে একটি বিষধর সাপ দংশন করে। তবে আধুনিক চিকিৎসায় না গিয়ে গ্রামীণ কুসংস্কারের বশে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বা কোনো চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে স্থানীয় বাঁধেরহাট এলাকার এক ওঝার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে ঝাড়ফুঁকের অপচিকিৎসা। ওঝার বাড়িতেই মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়লে পরিবারের লোকজন দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরা জানান, সোনালী শুধু পড়াশোনাতেই ভালো ছিল না, বরং খেলাধুলা, স্কাউটিং এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার সরব উপস্থিতি ছিল। অত্যন্ত মিশুক স্বভাবের এই কিশোরী সবার প্রিয়পাত্র ছিল। সিনথী পাঠশালার প্রধান শিক্ষক আরিফুল ইসলাম সজীব গণমাধ্যমকে জানান, এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয় ভালো ফল করায় আগামী বৃহস্পতিবার একটি আনন্দ উৎসবের আয়োজন করার কথা ছিল। ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, মঙ্গলবার রাত আটটার দিকেও সোনালীর সঙ্গে তাঁর ফোনে আনন্দ উৎসবের পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছিল। একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও।

এদিকে সচেতনমহল মনে করছে, সচেতনতার অভাব এবং এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওঝা ও কবিরাজের ওপর অতিরিক্ত আস্থার কারণে বহু প্রাণ এভাবে ঝরে পড়ছে। সাপের কামড়ের মতো জরুরি ও জীবনঘাতী পরিস্থিতিতে সঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ বা হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে ওঝার কাছে সময় নষ্ট করার ফলে সোনালীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকদের মতে, সাপের কামড় দেওয়ার পরপরই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা মা রাশেদা খাতুন এখন বারবার বিলাপ করে বলছেন, ‘আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব?’ তাঁর এই আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চরাঞ্চলের বাতাস।

জনপ্রিয়

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বীনা স্মৃতি ঘাটে সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপার চিরতরে বন্ধ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

এসএসসি পাসের আনন্দ নিমিষেই বিষাদে: ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়ায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল মেধাবী সোনালীর

আপডেট : ১০:৪৪:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

পাবনার বেড়া উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিন পর বিষধর সাপের কামড়ে সোনালী আক্তার (১৬) নামের এক মেধাবী কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার ঢালারচর ইউনিয়নের দুর্গম চর মিরপুর গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। দরিদ্র পরিবারের এই অকাল প্রয়াণে গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশেষ করে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথার হয়ে গেছেন তাঁর মা রাশেদা খাতুন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোনালীর জন্মের আগেই বা শৈশবেই তার বাবা মারা যান। এরপর রাশেদা খাতুন তাঁর আরেক মেয়ের মৃত্যুর শোক সহ্য করে সোনালীকে নিয়ে পাবনার বেড়ার চর মিরপুর গ্রামে তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও একমাত্র মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়ে বড় করছিলেন তিনি। মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেই তিনি আর দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। সোনালীও মায়ের সেই ত্যাগের মূল্য দিতে প্রাণপণ পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় ‘সিনথী পাঠশালা’ থেকে চলতি বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ ৩.৫৬ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়।

গত রবিবার পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই পরিবারটিতে আনন্দের জোয়ার বইছিল। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই নেমে আসে কালরাত। মঙ্গলবার রাতে মায়ের সঙ্গে পাশের একটি বাড়ি থেকে নিজের ঘরে ফেরার পথে সোনালীকে একটি বিষধর সাপ দংশন করে। তবে আধুনিক চিকিৎসায় না গিয়ে গ্রামীণ কুসংস্কারের বশে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বা কোনো চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে স্থানীয় বাঁধেরহাট এলাকার এক ওঝার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে ঝাড়ফুঁকের অপচিকিৎসা। ওঝার বাড়িতেই মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়লে পরিবারের লোকজন দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরা জানান, সোনালী শুধু পড়াশোনাতেই ভালো ছিল না, বরং খেলাধুলা, স্কাউটিং এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার সরব উপস্থিতি ছিল। অত্যন্ত মিশুক স্বভাবের এই কিশোরী সবার প্রিয়পাত্র ছিল। সিনথী পাঠশালার প্রধান শিক্ষক আরিফুল ইসলাম সজীব গণমাধ্যমকে জানান, এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয় ভালো ফল করায় আগামী বৃহস্পতিবার একটি আনন্দ উৎসবের আয়োজন করার কথা ছিল। ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, মঙ্গলবার রাত আটটার দিকেও সোনালীর সঙ্গে তাঁর ফোনে আনন্দ উৎসবের পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছিল। একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও।

এদিকে সচেতনমহল মনে করছে, সচেতনতার অভাব এবং এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওঝা ও কবিরাজের ওপর অতিরিক্ত আস্থার কারণে বহু প্রাণ এভাবে ঝরে পড়ছে। সাপের কামড়ের মতো জরুরি ও জীবনঘাতী পরিস্থিতিতে সঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ বা হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে ওঝার কাছে সময় নষ্ট করার ফলে সোনালীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকদের মতে, সাপের কামড় দেওয়ার পরপরই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা মা রাশেদা খাতুন এখন বারবার বিলাপ করে বলছেন, ‘আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচব?’ তাঁর এই আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চরাঞ্চলের বাতাস।