বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট সংগঠক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘রোদনরূপসী’ গল্পগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। প্রকাশের দীর্ঘ তিন দশক পর ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বইটির পুনঃপাঠ পাঠককে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বাঙালি সমাজে একজন অসাধারণ উপস্থাপক, সফল সংগঠক ও সম্পাদক হিসেবে যতটা পরিচিত, কথাসাহিত্যিক হিসেবে ঠিক ততটাই অন্তরালে রয়ে গেছেন। অথচ তাঁর মাত্র চারটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত ৮৫ পৃষ্ঠার এই বইটি প্রমাণ করে, গল্পকার হিসেবে তিনি কতটা শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় ছিলেন। এই গল্পগুলোর স্থায়িত্ব ও মনে রাখার মতো ক্ষমতা ভালো সাহিত্যের অন্যতম প্রধান শর্ত পূরণ করে।
বইটির প্রথম গল্প ‘ল্যাজারাসের প্রত্যাবর্তন’ আমাদের নিয়ে যায় উত্তরবঙ্গের এক জেলা শহরের একসময়ের নামজাদা গায়কের কাছে। নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য জীবনের সব অর্জন ও গৌরব বিসর্জন দেওয়া এই শিল্পী শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হন। এরপর চরম অবহেলা ও আত্মনিগ্রহের মাধ্যমে তিনি নিজের সম্ভাবনাকে তিলে তিলে ধ্বংস করেন। গল্পটিতে মূলত গায়কের শেষবারের মতো জ্বলে ওঠার ক্ষণটিকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কথক, যিনি নিজে ছিলেন রেডিওর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। গায়কের ক্ষয়ে যাওয়া কণ্ঠ আর তাঁর রাজকীয় অথচ বিষণ্ণ চাহনির যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদি গল্পের গভীরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। ম্যাক্সিম গোর্কি কিংবা আন্তন চেখভের গল্পের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং ও. হেনরির ভাষার ঐশ্বর্য এই গল্পে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
পরবর্তী গল্প ‘বেহুলা-ভাসান’ মূলত ঢাকা শহরের নাগরিক অবক্ষয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পতনের এক নির্মম দলিল। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আজাদের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’—যেন ১৯৮৫ সালে লেখা এই গল্পের মূল সুরকে প্রতিধ্বনিত করে। মফস্বল থেকে আসা এক কলেজ শিক্ষকের মেয়ে যখন ঢাকার কর্পোরেট দুনিয়া ও আধুনিক অভিজাত সমাজের পার্টি লাইফে অভ্যস্ত হতে চেষ্টা করে, তখন সে এক অন্ধকার বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। সম্পর্কের টানাপোড়েন, স্বামীর বিশ্বাসভঙ্গ আর লোলুপ পুরুষদের হাত থেকে নিজের সম্মান বাঁচাতে গিয়ে সে একপর্যায়ে চরম প্রতিশোধের পথ বেছে নেয়। এই গল্পে চিত্রিত আধুনিক ও মার্জিত পোশাকধারী শিল্পপতির চরিত্রটি বর্তমান যুগের অনেক আলোচিত যৌন কেলেঙ্কারির খলনায়কদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। গল্পটির সমাজবাস্তবতা পাঠককে গভীরভাবে আলোড়িত করে。
বইটির টাইটেল গল্প ‘রোদনরূপসী’ পাঠককে এক ধরনের অস্বস্তিকর মনস্তাত্ত্বিক জার্নির মুখোমুখি দাঁড় করায়। এক কামুক ও শিকারি স্বভাবের তরুণের স্বীকারোক্তি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই গল্প। নিজের বোনের এক বান্ধবীর প্রতি দীর্ঘদিনের লোলুপ দৃষ্টির পর এক নির্জন মুহূর্তে সে মেয়েটিকে ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েটির প্রতিরোধ নয়, বরং তার অবিরত ও অসহায় কান্না তরুণটির ভেতরে এক অদ্ভুত ভাবান্তর সৃষ্টি করে। কান্নার সেই আদিম রূপের মাঝে সে এক অনন্য ‘রোদনরূপসী’কে আবিষ্কার করে এবং নিজের পাপবোধের কাছে হেরে গিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। আজকের দিনে অপরাধপ্রবণ কিন্তু দুর্বলচিত্তের এমন পুরুষ চরিত্র অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, তবে লেখকের নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গল্পটিকে অনন্য করে তুলেছে।
সবশেষে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ গল্পটি পাঠককে নিয়ে যায় এক গভীর নৈতিক সংকটের সামনে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বেতার কেন্দ্রে চাকরি নেওয়া মাযহার নামের এক মুক্তিযোদ্ধা যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সহকর্মীদের সাথে নিয়ে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আদায়ের আন্দোলনে সফল হন, তখন তাঁর মনে এক তীব্র আত্মজিজ্ঞাসার জন্ম নেয়। যে দেশপ্রেমের তাড়নায় তিনি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, সামান্য বাড়তি সুবিধার বিনিময়ে কি তিনি সেই মহান চেতনাকে বিক্রি করে দিলেন? এই সূক্ষ্ম নৈতিক বিচ্যুতি আজকের সমাজে হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু আদর্শের পথ থেকে এই সন্তর্পণে সরে যাওয়াই যে পরবর্তীতে বিশাল দুর্নীতির পথ তৈরি করে, লেখক তা অত্যন্ত দরদ দিয়ে তুলে ধরেছেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিশেষণবহুল ভাষা ও প্রাঞ্জল বর্ণনা চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছে এবং তিন দশক পরেও এই বইটির সাহিত্যিক গুরুত্ব ও নৈতিক আবেদন সমানভাবে প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।
রিপোর্টার নাম: 
























