১৯৩২ সালে পারস্য (বর্তমান ইরান) সফরে গিয়ে সে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং বিশিষ্টজনদের সান্নিধ্যে এসেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই ঐতিহাসিক সফরের সময় তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন ইরানি সাংসদ ও বুদ্ধিজীবী দিকান দেশ্তি। দুই মনীষীর এই কথোপকথনে উঠে এসেছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সংগীত এবং আধুনিক সভ্যতার নানা সংকট ও সম্ভাবনার কথা।
সফরের শেষ পর্যায়ে পারস্য ছেড়ে আসার প্রাক্কালে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, ভাষা ও দূরত্বের প্রাচীর ভেদ করে তিনি কীভাবে পারস্যের মানুষের সঙ্গে একটি আত্মিক যোগসূত্র অনুভব করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলার সঙ্গে পারস্যের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহুদিনের। তাঁর নিজ পরিবারেও ফারসি মরমি সাহিত্য ও শিল্পের এক গভীর প্রভাব ছিল। এমনকি বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারেও ফারসি ভাষার অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে, যা দুই সংস্কৃতির অভিন্ন মেলবন্ধনেরই সাক্ষ্য দেয়।
সাক্ষাৎকারে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা এবং যান্ত্রিক জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন রবীন্দ্রনাথ। তৎকালীন পারস্যে মার্কিন সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ বা ‘মার্কিনায়ন’-এর ধারণার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেন, বাহ্যিক চাকচিক্য ও বস্তুবাদী উন্নয়ন মানুষকে আত্মিক শান্তি দিতে পারে না। ইউরোপীয় সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ না করে প্রাচ্যের নিজস্ব ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং বিচারবুদ্ধি বজায় রাখার ওপর জোর দেন তিনি। মানবসভ্যতার সংকট উত্তরণে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুস্থ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বিশ্বকবি।
প্রথম আলোর ‘শুক্রবারের সাময়িকী’-তে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি পরবর্তীতে অনলাইন সংস্করণের পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি কেবল একটি সাধারণ সাক্ষাৎকার নয়, বরং দুই প্রাচীন সভ্যতার মেলবন্ধন এবং বিশ্বমানবিকতার এক অনন্য দলিল হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
রিপোর্টার নাম: 






















