Hi

০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুকুর না বিড়াল: কোন পোষা প্রাণীর বুদ্ধি বেশি? যা বলছেন বিজ্ঞানীরা

গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে কুকুর ও বিড়াল মানুষের পরম বন্ধু। যাঁরা এই প্রাণকূলকে ভালোবেসে ঘরে লালন-পালন করেন, তাঁদের মনে প্রায়ই একটি চিরন্তন প্রশ্ন জাগে—তাঁদের আদরের পোষ্যটিই কি তবে সবচেয়ে বেশি চালাক বা বুদ্ধিমান? তবে আধুনিক প্রাণীবিজ্ঞান ও আচরণ গবেষকদের মতে, কুকুর এবং বিড়ালের বুদ্ধিমত্তার সরল তুলনা করা এক প্রকার অসম্ভব। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বুদ্ধিমত্তার পরিমাপ কোনো একক বা সরল মানদণ্ডে মাপা যায় না। বরং প্রতিটি প্রাণী নিজ নিজ পরিবেশ, জীবনযাত্রা এবং টিকে থাকার তাগিদে অনন্য দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে।

কুকুরের মনস্তত্ত্ব ও আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রা হোরোউইটজ। তাঁর মতে, গবেষকেরা কোনো প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা সরাসরি পরিমাপ করেন না; বরং তারা পর্যবেক্ষণ করেন একটি প্রাণী কীভাবে নতুন বিষয় শেখে, স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে এবং প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করে। আরেক প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক ব্রায়ান হেয়ার এই বিষয়টি বোঝাতে চমৎকার একটি তুলনা টেনেছেন। তাঁর মতে, কুকুর এবং বিড়ালের বুদ্ধির তুলনা করা মানে মূলত একটি হাতুড়ি এবং একটি স্ক্রু-ড্রাইভারের মধ্যে কোনটি ভালো তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করা। আসলে কোন যন্ত্রটি ভালো বা উপযোগী, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে নির্দিষ্ট কাজের ওপর।

বিজ্ঞানীদের মতে, বুদ্ধিমত্তাকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়—সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে শেখার দক্ষতা এবং সামাজিক বুদ্ধিমত্তা। অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে বিড়াল বুঝি মানুষকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। বিড়ালদের সামাজিক বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত প্রখর এবং তা অনেকটাই কুকুরের কাছাকাছি। এরা নিজেদের নাম চিনতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতে ভালোবাসে। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো মানুষ যদি বিড়ালের প্রতি বাড়তি মনোযোগ ও যত্ন দেয়, তবে বিড়ালটিও তার সঙ্গে তুলনামূলক বেশি সময় অতিবাহিত করে।

অন্যদিকে, মানুষের ইশারা বুঝে গোপন খাবারের সন্ধান করার মতো পরীক্ষায় কুকুর ও বিড়াল উভয়কেই সমান পারদর্শী দেখা গেছে। তবে আচরণগত এই পার্থক্যের মূল কারণ মানুষের সঙ্গে এই দুই প্রাণীর ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিন্নতা। হাজার হাজার বছর ধরে কুকুর মানুষের সঙ্গে কাজ ও শিকারে অংশীদার হয়েছে। ফলে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা বা সাহায্যের জন্য মানুষের কাছে যাওয়া কুকুরের সহজাত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিপরীত দিকে, বিড়াল বরাবরই স্বাধীনচেতা স্বভাবের। এরা নিজেদের কাজ নিজে করতে এবং নিজস্ব মেজাজে চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

মস্তিষ্কের আকারের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, যার মস্তিষ্ক যত বড়, তার বুদ্ধিও তত বেশি। এই নিয়ম পুরোপুরি সত্য হলে কুকুর স্বভাবতই বিড়ালের চেয়ে এগিয়ে থাকত। ২০১৪ সালে অধ্যাপক ব্রায়ান হেয়ার এবং অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভান ম্যাকলিনের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বড় গবেষণায় দেখা যায়, বড় মস্তিষ্কের প্রাণীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা নিজেকে সংযত রাখার ক্ষমতা বেশি থাকে। তবে সেই গবেষণায় কোনো বিড়ালকে অন্তর্ভুক্ত না করায় নিশ্চিত করে বলা যায়নি যে ছোট মস্তিষ্কের কারণে বিড়াল ওই পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ত কি না।

বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন ভিটালের মতে, পোষা প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা বিকাশে মানুষের আচরণও একটি বড় ভূমিকা রাখে। কুকুরকে যেভাবে ছোটবেলা থেকেই সামাজিকীকরণ, প্রশিক্ষণ ও বাইরে ঘোরানোর সুযোগ দেওয়া হয়, বিড়ালের ক্ষেত্রে মালিকেরা অনেক সময় তা করেন না। সব মিলিয়ে, কুকুর ও বিড়ালের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা অর্থহীন। কুকুর যেমন মানুষের নির্দেশ পালনে এবং সামাজিক মেলামেশায় অতুলনীয়, বিড়াল তেমনই স্বাধীন বুদ্ধিমত্তায় অনন্য। মানুষের সঙ্গে এই চমৎকার বন্ধনে উভয়েই নিজেদের জায়গাসেরা পোষ্য হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চলেছে।

জনপ্রিয়

দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে কূটনৈতিক অস্বস্তি

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

কুকুর না বিড়াল: কোন পোষা প্রাণীর বুদ্ধি বেশি? যা বলছেন বিজ্ঞানীরা

আপডেট : ০৭:২৩:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে কুকুর ও বিড়াল মানুষের পরম বন্ধু। যাঁরা এই প্রাণকূলকে ভালোবেসে ঘরে লালন-পালন করেন, তাঁদের মনে প্রায়ই একটি চিরন্তন প্রশ্ন জাগে—তাঁদের আদরের পোষ্যটিই কি তবে সবচেয়ে বেশি চালাক বা বুদ্ধিমান? তবে আধুনিক প্রাণীবিজ্ঞান ও আচরণ গবেষকদের মতে, কুকুর এবং বিড়ালের বুদ্ধিমত্তার সরল তুলনা করা এক প্রকার অসম্ভব। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বুদ্ধিমত্তার পরিমাপ কোনো একক বা সরল মানদণ্ডে মাপা যায় না। বরং প্রতিটি প্রাণী নিজ নিজ পরিবেশ, জীবনযাত্রা এবং টিকে থাকার তাগিদে অনন্য দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে।

কুকুরের মনস্তত্ত্ব ও আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রা হোরোউইটজ। তাঁর মতে, গবেষকেরা কোনো প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা সরাসরি পরিমাপ করেন না; বরং তারা পর্যবেক্ষণ করেন একটি প্রাণী কীভাবে নতুন বিষয় শেখে, স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে এবং প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করে। আরেক প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক ব্রায়ান হেয়ার এই বিষয়টি বোঝাতে চমৎকার একটি তুলনা টেনেছেন। তাঁর মতে, কুকুর এবং বিড়ালের বুদ্ধির তুলনা করা মানে মূলত একটি হাতুড়ি এবং একটি স্ক্রু-ড্রাইভারের মধ্যে কোনটি ভালো তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করা। আসলে কোন যন্ত্রটি ভালো বা উপযোগী, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে নির্দিষ্ট কাজের ওপর।

বিজ্ঞানীদের মতে, বুদ্ধিমত্তাকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়—সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে শেখার দক্ষতা এবং সামাজিক বুদ্ধিমত্তা। অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে বিড়াল বুঝি মানুষকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। বিড়ালদের সামাজিক বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত প্রখর এবং তা অনেকটাই কুকুরের কাছাকাছি। এরা নিজেদের নাম চিনতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতে ভালোবাসে। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো মানুষ যদি বিড়ালের প্রতি বাড়তি মনোযোগ ও যত্ন দেয়, তবে বিড়ালটিও তার সঙ্গে তুলনামূলক বেশি সময় অতিবাহিত করে।

অন্যদিকে, মানুষের ইশারা বুঝে গোপন খাবারের সন্ধান করার মতো পরীক্ষায় কুকুর ও বিড়াল উভয়কেই সমান পারদর্শী দেখা গেছে। তবে আচরণগত এই পার্থক্যের মূল কারণ মানুষের সঙ্গে এই দুই প্রাণীর ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিন্নতা। হাজার হাজার বছর ধরে কুকুর মানুষের সঙ্গে কাজ ও শিকারে অংশীদার হয়েছে। ফলে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা বা সাহায্যের জন্য মানুষের কাছে যাওয়া কুকুরের সহজাত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিপরীত দিকে, বিড়াল বরাবরই স্বাধীনচেতা স্বভাবের। এরা নিজেদের কাজ নিজে করতে এবং নিজস্ব মেজাজে চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

মস্তিষ্কের আকারের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, যার মস্তিষ্ক যত বড়, তার বুদ্ধিও তত বেশি। এই নিয়ম পুরোপুরি সত্য হলে কুকুর স্বভাবতই বিড়ালের চেয়ে এগিয়ে থাকত। ২০১৪ সালে অধ্যাপক ব্রায়ান হেয়ার এবং অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভান ম্যাকলিনের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বড় গবেষণায় দেখা যায়, বড় মস্তিষ্কের প্রাণীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা নিজেকে সংযত রাখার ক্ষমতা বেশি থাকে। তবে সেই গবেষণায় কোনো বিড়ালকে অন্তর্ভুক্ত না করায় নিশ্চিত করে বলা যায়নি যে ছোট মস্তিষ্কের কারণে বিড়াল ওই পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ত কি না।

বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন ভিটালের মতে, পোষা প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা বিকাশে মানুষের আচরণও একটি বড় ভূমিকা রাখে। কুকুরকে যেভাবে ছোটবেলা থেকেই সামাজিকীকরণ, প্রশিক্ষণ ও বাইরে ঘোরানোর সুযোগ দেওয়া হয়, বিড়ালের ক্ষেত্রে মালিকেরা অনেক সময় তা করেন না। সব মিলিয়ে, কুকুর ও বিড়ালের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা অর্থহীন। কুকুর যেমন মানুষের নির্দেশ পালনে এবং সামাজিক মেলামেশায় অতুলনীয়, বিড়াল তেমনই স্বাধীন বুদ্ধিমত্তায় অনন্য। মানুষের সঙ্গে এই চমৎকার বন্ধনে উভয়েই নিজেদের জায়গাসেরা পোষ্য হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চলেছে।