১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যা বহু মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। এই লড়াইয়ে অনেকেই হারিয়েছেন তাদের মূল্যবান অঙ্গ, কেউ বা চিরতরে হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। এমনই এক বীর যোদ্ধা হলেন ৭০ বছর বয়সী রাজকুমার রায়। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি তার দুই চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়েছেন। কিন্তু এই নির্মম শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি; বরং জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তিনি বেছে নিয়েছেন এক অনন্য পথ। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে—প্রায় ৪৫ বছর ধরে—তিনি বাঁশির সুরে সুরেই নিজের জীবন ও জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজকুমার রায়ের এই সংগ্রামী জীবন কেবল ব্যক্তিগত টিকে থাকার গল্প নয়, বরং এটি এক অদম্য মানবাত্মার প্রতীক। ১৯৭০-এর দশকের উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি সম্মুখ সমরে অংশ নেন। সেই যুদ্ধের ভয়াবহতায় তার দুটি চোখ অন্ধ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হলেও রাজকুমারের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা স্বস্তি আসেনি; শুরু হয় এক নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। পরিবারের অন্নসংস্থান এবং নিজের বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি কোনো ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেননি। এর পরিবর্তে তিনি বেছে নেন সঙ্গীতের এক কোমল মাধ্যম—বাঁশি বাদন।
প্রতিদিনের রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাজকুমার রায় বিভিন্ন জনবহুল এলাকায়, রেলওয়ে স্টেশন বা বাসে বাঁশি বাজিয়ে সময় কাটান। তার বাঁশির সুরে মিশে থাকে বিষাদ, সংগ্রাম এবং দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসার সুর। পথচারী ও সাধারণ মানুষের দেওয়া সামান্য অনুদান দিয়েই তার প্রতিদিনের সংসার চলে। বয়স বাড়লেও তার হাতের বাঁশির জাদুকরী সুর আজও পথচারীদের মনে দাগ কাটে। তবে এই বয়সে এসে জীবন আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে আগের মতো দীর্ঘ সময় বাঁশি বাজানো তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে মাঝেমধ্যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারেনি। স্থানীয় সচেতন মহল ও তরুণ সমাজ মনে করে, এই বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ জীবন যেন মর্যাদার সঙ্গে কাটে, সে জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে স্থায়ী পুনর্বাসন অত্যন্ত জরুরি। রাজকুমার রায়ের মতো যারা নিজেদের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছেন, তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন করা বর্তমান সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। বাঁশির সুরে মুখরিত রাজকুমারের এই জীবনসংগ্রাম আমাদের শিখিয়ে দেয়—কঠিনতম প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে হয়।
রিপোর্টার নাম: 




















