Hi

০৯:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারের চিত্র বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে এক গভীর সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বর্তমানে ‘রেসকিউ ও স্যালভেজ অপারেশন’ বা উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আশা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আগামী এক বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যাবে।

বর্তমান সরকার দেশের আর্থিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এতদিন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অর্থায়ন ব্যবস্থা অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যাংকনির্ভর ছিল। এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর করতে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণের সমন্বয়ে নতুন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এজন্য সরকার প্রয়োজনে কঠোর ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরিস্থিতি বদলাতে কিছু কঠিন ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হলেও এর বিকল্প নেই। বিনিয়োগকারী, সরকার ও বেসরকারি খাত—সবাই মূলত ব্যাংকনির্ভর। অথচ স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ায় কাঠামোগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। তাই ‘হাই স্ট্রিট ব্যাংকিং’ থেকে বের হয়ে ‘ওয়াল স্ট্রিটে’ যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে বিকল্প অর্থায়নের প্রধান পথ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান একা সফল হতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

আমির খসরু বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজারকে যে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময়ে নামমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হলেও কোনো স্থায়ী সুফল মেলেনি। এখন পুঁজিবাজারকে ‘ক্যাসিনো’ সংস্কৃতির বাইরে এনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল একটি একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেমের আওতায় কাজ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বীমা ও পেনশন খাতের অর্থ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইপিওতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে মূল্যায়ন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এই যাত্রায় উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব পুঁজিবাজার থেকেই অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে অর্থমন্ত্রী মত প্রকাশ করেন। তিনি নিউ ইয়র্ক ডলার বন্ড, হংকংয়ে বাংলাদেশভিত্তিক ইকুইটি ফান্ডসহ নানা ধরণের বন্ড চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি, ব্রোকার ও স্টক এক্সচেঞ্জের মতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার ঘানি গত চার মাসে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার পদক্ষেপের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরাসরি তালিকাভুক্তির নিয়ম পুনর্গঠন, আইপিও অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে তিন মাসে নামিয়ে আনা, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া এবং সার্কিট ব্রেকার ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে কনভার্টিবল বন্ড, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিটস) এবং কর্মীদের ইকুইটি স্টক অপশন চালুর কাজ চলমান রয়েছে। বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান তার বক্তব্যে পুঁজিবাজারের অনিয়ম ও প্রতারণা রোধে ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, ব্রোকারদের ব্যাক অফিস সফটওয়্যার একীভূত করা, রিয়েল টাইম নজরদারি এবং অ্যাপভিত্তিক অর্ডার ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে চার সংস্থার মাসিক সমন্বয় সভা শুরু হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

জনপ্রিয়

আইএমএফের ঋণচুক্তি বাতিল, শর্ত মানবে না বাংলাদেশ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

এক বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারের চিত্র বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী

আপডেট : ০৮:২৮:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে এক গভীর সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বর্তমানে ‘রেসকিউ ও স্যালভেজ অপারেশন’ বা উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আশা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আগামী এক বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যাবে।

বর্তমান সরকার দেশের আর্থিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এতদিন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অর্থায়ন ব্যবস্থা অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যাংকনির্ভর ছিল। এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর করতে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণের সমন্বয়ে নতুন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এজন্য সরকার প্রয়োজনে কঠোর ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরিস্থিতি বদলাতে কিছু কঠিন ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হলেও এর বিকল্প নেই। বিনিয়োগকারী, সরকার ও বেসরকারি খাত—সবাই মূলত ব্যাংকনির্ভর। অথচ স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ায় কাঠামোগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। তাই ‘হাই স্ট্রিট ব্যাংকিং’ থেকে বের হয়ে ‘ওয়াল স্ট্রিটে’ যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে বিকল্প অর্থায়নের প্রধান পথ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান একা সফল হতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

আমির খসরু বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজারকে যে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময়ে নামমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হলেও কোনো স্থায়ী সুফল মেলেনি। এখন পুঁজিবাজারকে ‘ক্যাসিনো’ সংস্কৃতির বাইরে এনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল একটি একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেমের আওতায় কাজ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বীমা ও পেনশন খাতের অর্থ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইপিওতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে মূল্যায়ন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এই যাত্রায় উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব পুঁজিবাজার থেকেই অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে অর্থমন্ত্রী মত প্রকাশ করেন। তিনি নিউ ইয়র্ক ডলার বন্ড, হংকংয়ে বাংলাদেশভিত্তিক ইকুইটি ফান্ডসহ নানা ধরণের বন্ড চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি, ব্রোকার ও স্টক এক্সচেঞ্জের মতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার ঘানি গত চার মাসে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার পদক্ষেপের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরাসরি তালিকাভুক্তির নিয়ম পুনর্গঠন, আইপিও অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে তিন মাসে নামিয়ে আনা, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া এবং সার্কিট ব্রেকার ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে কনভার্টিবল বন্ড, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিটস) এবং কর্মীদের ইকুইটি স্টক অপশন চালুর কাজ চলমান রয়েছে। বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান তার বক্তব্যে পুঁজিবাজারের অনিয়ম ও প্রতারণা রোধে ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, ব্রোকারদের ব্যাক অফিস সফটওয়্যার একীভূত করা, রিয়েল টাইম নজরদারি এবং অ্যাপভিত্তিক অর্ডার ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে চার সংস্থার মাসিক সমন্বয় সভা শুরু হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।