Hi

১২:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ: সমাজ ও রাজনীতির চিরন্তন বৈপরীত্য এবং বর্তমান বাস্তবতা

আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত প্রবাদ ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’ কেবল একটি গ্রামীণ প্রবচন নয়, বরং এটি মানবজীবনের দীর্ঘস্থায়ী বৈপরীত্য ও সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম বাস্তব দলিল। বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাসে যখন কৃষকের ঘরে নতুন ধান ওঠে এবং পিঠাপুলির উৎসবে মুখরিত হয় গৃহস্থের আঙিনা, ঠিক তখনই তীব্র শীতে চরম দুর্দশায় দিন কাটায় দিনমজুর ও প্রান্তিক মানুষেরা। একই সময়ে কারও জীবনে নেমে আসে আনন্দের বন্যা, আর কারও জীবনে আসে ধ্বংসের ছায়া। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের চিত্র সমাজের প্রতিটি স্তরে নানাভাবে প্রতিফলিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।

আধুনিক সভ্যতার বিকাশ এবং উন্নয়নের ধারাতেও এই একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। যান্ত্রিক অগ্রগতি ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনেক পুরোনো পেশা বিলুপ্ত হয়েছে, যা একশ্রেণির মানুষের জীবনে ডেকে এনেছে বিপর্যয়। ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি, ঘানি কিংবা বলদে টানা লাঙল আজ কেবল ইতিহাসের পাতা। নতুন সেতু বা সড়ক নির্মাণের ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ হলেও কর্মহীন হয়ে পড়েন বহু নৌকার মাঝি বা স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক। তবে এর বিপরীত দিকটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামীণ নারীরা শতবর্ষ ধরে যে পারিবারিক শৃঙ্খল ও দাসত্বের জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন, শহুরে পোশাক কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে তারা স্বাধীনতার এক নতুন স্বাদ খুঁজে পেয়েছেন। তাদের হাতে আসা কাঁচা টাকা তাদের জীবনযাত্রায় এনেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের সময় গ্রামীণ সমাজকাঠামো ভেঙে যেভাবে মানুষ শহরের কারখানায় আশ্রয় নিয়েছিল, বাংলার নারীশ্রমের উত্থানও অনেকটা তেমনি এক সামাজিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।

রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদলও সমাজের এই দ্বান্দ্বিক রূপটিকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটেছে, তা একদল মানুষের কাছে মুক্তির বার্তা নিয়ে এলেও অন্যপক্ষের জন্য বয়ে এনেছে ভয় ও অনিশ্চয়তা। পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে নতুন শক্তি জায়গা দখল করার প্রক্রিয়ায় প্রায়শই দীর্ঘদিনের জমে থাকা হিংসা ও প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সমাজের একটি বিশেষ অংশ অতীতে যেভাবে সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে, আজ তাদের স্থলাভিষিক্ত হওয়া নতুন গোষ্ঠীও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই একই সুযোগ দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের চরম হতাশায় ফেলছে। মেধা ও সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে চাঁদাবাজদের কবলে পড়ে ব্যবসায়ীদের অনেকে আজ দেশের শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

এই বহুমুখী সংকট ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সমাজবিশ্লেষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদী আশাবাদের পাশাপাশি অনেক সময় কঠোর শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উচ্চারিত হয়। তবে পরিশেষে বলা যায়, সমাজের এই বৈপরীত্য এবং ভাঙা-গড়ার খেলা মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতিহাসের প্রতিটি বড় ঝড়ের পর যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়, তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কাটিয়ে একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও শৃঙ্খলিত সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের সচেতন নাগরিক ও নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তায়।

জনপ্রিয়

কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ: সমাজ ও রাজনীতির চিরন্তন বৈপরীত্য এবং বর্তমান বাস্তবতা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ: সমাজ ও রাজনীতির চিরন্তন বৈপরীত্য এবং বর্তমান বাস্তবতা

আপডেট : ১১:২২:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত প্রবাদ ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’ কেবল একটি গ্রামীণ প্রবচন নয়, বরং এটি মানবজীবনের দীর্ঘস্থায়ী বৈপরীত্য ও সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম বাস্তব দলিল। বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাসে যখন কৃষকের ঘরে নতুন ধান ওঠে এবং পিঠাপুলির উৎসবে মুখরিত হয় গৃহস্থের আঙিনা, ঠিক তখনই তীব্র শীতে চরম দুর্দশায় দিন কাটায় দিনমজুর ও প্রান্তিক মানুষেরা। একই সময়ে কারও জীবনে নেমে আসে আনন্দের বন্যা, আর কারও জীবনে আসে ধ্বংসের ছায়া। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের চিত্র সমাজের প্রতিটি স্তরে নানাভাবে প্রতিফলিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।

আধুনিক সভ্যতার বিকাশ এবং উন্নয়নের ধারাতেও এই একই নিয়মের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। যান্ত্রিক অগ্রগতি ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনেক পুরোনো পেশা বিলুপ্ত হয়েছে, যা একশ্রেণির মানুষের জীবনে ডেকে এনেছে বিপর্যয়। ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি, ঘানি কিংবা বলদে টানা লাঙল আজ কেবল ইতিহাসের পাতা। নতুন সেতু বা সড়ক নির্মাণের ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ হলেও কর্মহীন হয়ে পড়েন বহু নৌকার মাঝি বা স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক। তবে এর বিপরীত দিকটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামীণ নারীরা শতবর্ষ ধরে যে পারিবারিক শৃঙ্খল ও দাসত্বের জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন, শহুরে পোশাক কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে তারা স্বাধীনতার এক নতুন স্বাদ খুঁজে পেয়েছেন। তাদের হাতে আসা কাঁচা টাকা তাদের জীবনযাত্রায় এনেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের সময় গ্রামীণ সমাজকাঠামো ভেঙে যেভাবে মানুষ শহরের কারখানায় আশ্রয় নিয়েছিল, বাংলার নারীশ্রমের উত্থানও অনেকটা তেমনি এক সামাজিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।

রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদলও সমাজের এই দ্বান্দ্বিক রূপটিকে বারবার সামনে নিয়ে আসে। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটেছে, তা একদল মানুষের কাছে মুক্তির বার্তা নিয়ে এলেও অন্যপক্ষের জন্য বয়ে এনেছে ভয় ও অনিশ্চয়তা। পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে নতুন শক্তি জায়গা দখল করার প্রক্রিয়ায় প্রায়শই দীর্ঘদিনের জমে থাকা হিংসা ও প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সমাজের একটি বিশেষ অংশ অতীতে যেভাবে সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে, আজ তাদের স্থলাভিষিক্ত হওয়া নতুন গোষ্ঠীও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই একই সুযোগ দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের চরম হতাশায় ফেলছে। মেধা ও সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে চাঁদাবাজদের কবলে পড়ে ব্যবসায়ীদের অনেকে আজ দেশের শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

এই বহুমুখী সংকট ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সমাজবিশ্লেষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদী আশাবাদের পাশাপাশি অনেক সময় কঠোর শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উচ্চারিত হয়। তবে পরিশেষে বলা যায়, সমাজের এই বৈপরীত্য এবং ভাঙা-গড়ার খেলা মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতিহাসের প্রতিটি বড় ঝড়ের পর যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়, তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কাটিয়ে একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও শৃঙ্খলিত সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের সচেতন নাগরিক ও নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তায়।