নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঘটে যাওয়া এক অমানবিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীর ওয়াকওয়েতে চলাচলের সময় চতুর্থ শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে পেছন থেকে এক বখাটে কিশোরের সজোরে লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তবে এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক ও আশ্চর্যজনক দিক হলো, বখাটের দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হওয়ার পরও ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীকে কোনো আইনি সুরক্ষা বা ন্যায়বিচার না দিয়ে উল্টো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে টিসি (সার্টিফিকেট অব ট্রান্সফার) দিয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিসা আক্তার এবং সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম আক্তার বিদ্যালয় ছুটির পর বা ফাঁকে কাঁচপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়সংলগ্ন ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটছিল। এ সময় স্থানীয় এক বখাটে কিশোর, যার পরিচয় পরবর্তীতে দিলশাদ হোসেন হিসেবে নিশ্চিত করা হয়, কোনো কারণ ছাড়াই পেছন থেকে তানিসা আক্তারকে সজোরে দুটি লাথি মারে। বখাটের এহেন উগ্র আচরণ এবং আকস্মিক আক্রমণে মেয়েটি মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার একটি ভিডিও দূর থেকে কোনো এক ব্যক্তি গোপনে তার মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে ভিডিওটি গোপন থাকলেও গত বৃহস্পতিবার (৬ জুলাই) দুপুরের পর এটি হঠাৎ করেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তীব্র জনরোষ তৈরি হয়। নেটব্যবহারকারী থেকে শুরু করে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ওই বখাটে কিশোর দিলশাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয়ভাবে একটি সালিশি বৈঠকের আয়োজন করা হয় যেখানে অভিযুক্ত কিশোরকে কান ধরে উঠবস করানো হয় এবং সে তার অপরাধ স্বীকার করে জনসমক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে জানায় যে সে ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবে না এবং এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তবে এই সালিশ ও লঘু দণ্ডের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে স্কুলছাত্রী বখাটের লালসার শিকার হলো, তার ওপরই খড়্গহস্ত হয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভুক্তভোগী তানিসার বাবা শাহীন মিয়া সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনার সময় স্কুল চলাকালীন বাইরে ঘোরাফেরা করার অভিযোগে ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিচার বসিয়ে তার মেয়ে তানিসাকে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে বের করে দিয়েছেন। অথচ যে বখাটে কিশোর প্রকাশ্য দিবালোকে একজন স্কুলছাত্রীকে শারীরিক লাঞ্ছনা করল, তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য মেলেনি। অভাবের তাড়নায় দিনমজুরি করে চলা শাহীন মিয়া এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মেয়ের ওপর ঘটে যাওয়া পৈশাচিক নির্যাতনের বিচার চাওয়ার বদলে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়ায় অসহায় এই পরিবারটি আরও বিপাকে পড়েছে।
এ বিষয়ে কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন যে, স্কুল কমিটির সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ওই দুই ছাত্রীকে টিসি প্রদান করা হয়েছে। তার মতে, যেহেতু পুরো ঘটনাটি বিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে, তাই স্থানীয় লোকজন ও সালিশদাররা ছেলে ও মেয়েদের বিচার করেছেন। তবে বিদ্যালয়ের বাইরে ঘটে যাওয়া অপরাধের দায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে তাদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত করে তোলার এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নড়েচড়ে বসেছে। সোনারগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি তাদের নজরে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এই ঘটনাটি দেশের নারী ও শিশু নিরাপত্তা, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক নতুন প্রশ্ন চিহ্ন তুলে ধরেছে।
রিপোর্টার নাম: 


















