Hi

০১:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩০ বছরের বিশ্বভ্রমণ: লি ও ম্যান্ডির প্রেম, ১২৭ দেশ ও বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ টান

ত্রিশ বছর ধরে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ম্যান্ডি হেলসে ও যুক্তরাজ্যের লি গ্রিন। তাঁদের এই অসাধারণ ভ্রমণ শুধু নতুন নতুন গন্তব্য খোঁজার গল্প নয়, এটি মানব হৃদয়ের গভীর সংযোগ ও ভালোবাসার এক অবিস্মরণীয় উপাখ্যান। ১২৭টি দেশ ভ্রমণের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁরা মানুষের গল্প শুনেছেন, সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন করেছেন এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ছিল তাঁদের ১২৭তম গন্তব্য, যেখানে লির এক বিশেষ ব্যক্তিগত আবেগ জড়িত।

১৯৯৬ সালে নেপালের অন্নপূর্ণা সার্কিটের এক পাহাড়ি পথে ম্যান্ডি ও লির প্রথম দেখা হয়েছিল। সেই সময় আজকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, স্মার্টফোন বা গুগল ম্যাপের মতো প্রযুক্তি ছিল না। ভ্রমণ মানেই ছিল সত্যিকারের অজানা পথে পা বাড়ানো। নিউজিল্যান্ড থেকে একা ব্যাকপ্যাক নিয়ে নেপালে এসেছিলেন ম্যান্ডি, যাঁর মূল গন্তব্য ছিল ইংল্যান্ডে এক বন্ধুর কাছে যাওয়া। অন্যদিকে, লি ইংল্যান্ড থেকে বন্ধুদের নিয়ে সাইকেলে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভেস্তে যাওয়ায় তিনি বিমানে ভারত আসার সিদ্ধান্ত নেন। কাকতালীয়ভাবে তাঁদের দুজনের পথ এসে মিশেছিল অন্নপূর্ণার একটি ছোট্ট টি-হাউসে।

পাহাড়ি পথে দিনের পর দিন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতেই তাঁদের পরিচয় গভীর হয়। বরফগলা নদীর পাশ দিয়ে, ঝুলন্ত সেতু পেরিয়ে বা সরু পথ ধরে চলতে চলতে তাঁরা একে অপরের ভেতরের জগত উন্মোচন করেন। দেশের গল্প, পরিবারের কথা, স্বপ্ন, ভয় এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুই স্থান পায় তাঁদের কথোপকথনে। মজার ছলে ম্যান্ডি লি-কে শেখাচ্ছিলেন থাই ভাষার কিছু শব্দ, আর লি শেখাচ্ছিলেন স্প্যানিশ। ভালোবাসার কথা বলার প্রয়োজন হয়নি, কারণ কিছু অনুভূতি শব্দের বেড়া ভেঙে নিজেরাই পথ করে নেয়। পূর্ণিমার আলোয় তাঁদের প্রথম দেখা হয়েছিল ভ্যালেন্টাইনস ডেতে, আর কয়েকদিন পর তাতোপানির উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে পাহাড় আর নদীকে সাক্ষী রেখে তাঁরা প্রথম একে অপরকে চুম্বন করেন। এই স্মৃতিচারণার সময়ও ৩০ বছর পর লির চোখে সেই বিশেষ আলো স্পষ্ট ছিল, যা তাঁদের প্রেমের গভীরতা প্রমাণ করে।

এই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি আসে তাঁদের দেখা হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, যখন ম্যান্ডির পাসপোর্ট হারিয়ে যায়। নতুন পাসপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে কাঠমান্ডুতে অপেক্ষা করতে হয়, আর লি রওনা দেন এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের পথে। আজকের দিনে এটি হয়তো একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা বা ভিডিও কলের মাধ্যমে সমাধান করা যেত, কিন্তু ১৯৯৬ সালে ভালোবাসার একমাত্র ভাষা ছিল হাতে লেখা চিঠি। ম্যান্ডি এক রাতেই বারোটি চিঠি লেখেন এবং এভারেস্টগামী বাসে উঠে অচেনা ট্রেকারদের হাতে লি-র কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ জানান। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি চিঠিই লির কাছে পৌঁছেছিল এবং লি-ও উত্তর লিখেছিলেন, যা অন্য ট্রেকারদের হাত ধরে ফিরে এসেছিল ম্যান্ডির কাছে। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষগুলো বিনা পারিশ্রমিকে তাঁদের ভালোবাসার ডাকপিয়ন হয়ে উঠেছিলেন, যা মানবতাবোধের এক অনন্য নজির স্থাপন করে। এই চিঠিগুলোর কয়েকটি আজও তাঁরা সযত্নে রেখেছেন, যার পুরনো কাগজ হয়তো সময়ের সাক্ষ্য বহন করে, কিন্তু ভেতরের শব্দগুলো আজও অম্লান।

বাংলাদেশ ছিল তাঁদের ভ্রমণজীবনের ১২৭তম দেশ। প্রতিবেদকের কৌতূহল ছিল, কেন বাংলাদেশ? উত্তরে লি এক ভিন্ন ধরনের গল্প শোনান। তিনি স্মিত হেসে জানান যে, তাঁর জন্মদিন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস একই দিনে—২৬শে মার্চ। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মনে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে, যে দেশের জন্মদিন আর তাঁর জন্মদিন একই দিনে, একদিন সেই দেশটায় তাঁকে যেতেই হবে। এই ব্যক্তিগত সংযোগ প্রকৃতির টানে বা ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের চেয়েও গভীর এক মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করে। লি ও ম্যান্ডির ভ্রমণকাহিনী কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করার গল্প নয়, এটি মানুষের ভেতরের জগত আবিষ্কার এবং একে অপরের সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলার গল্প। তাঁদের দীর্ঘ এই যাত্রার সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি কোনো দর্শনীয় স্থান থেকে নয়, বরং একজন মানুষকে গভীরভাবে খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল, যা পৃথিবীর বুকে মানবতার অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ককে তুলে ধরে।

জনপ্রিয়

বিয়ের পাঁচ মাসেই বিচ্ছেদের গুঞ্জন: নীরবতা ভেঙে মুখ খুললেন অভিনেতা রণজয় বিষ্ণু, চাইলেন একান্ততা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

৩০ বছরের বিশ্বভ্রমণ: লি ও ম্যান্ডির প্রেম, ১২৭ দেশ ও বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ টান

আপডেট : ১২:২৩:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

ত্রিশ বছর ধরে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিউজিল্যান্ডের ম্যান্ডি হেলসে ও যুক্তরাজ্যের লি গ্রিন। তাঁদের এই অসাধারণ ভ্রমণ শুধু নতুন নতুন গন্তব্য খোঁজার গল্প নয়, এটি মানব হৃদয়ের গভীর সংযোগ ও ভালোবাসার এক অবিস্মরণীয় উপাখ্যান। ১২৭টি দেশ ভ্রমণের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁরা মানুষের গল্প শুনেছেন, সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন করেছেন এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ছিল তাঁদের ১২৭তম গন্তব্য, যেখানে লির এক বিশেষ ব্যক্তিগত আবেগ জড়িত।

১৯৯৬ সালে নেপালের অন্নপূর্ণা সার্কিটের এক পাহাড়ি পথে ম্যান্ডি ও লির প্রথম দেখা হয়েছিল। সেই সময় আজকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, স্মার্টফোন বা গুগল ম্যাপের মতো প্রযুক্তি ছিল না। ভ্রমণ মানেই ছিল সত্যিকারের অজানা পথে পা বাড়ানো। নিউজিল্যান্ড থেকে একা ব্যাকপ্যাক নিয়ে নেপালে এসেছিলেন ম্যান্ডি, যাঁর মূল গন্তব্য ছিল ইংল্যান্ডে এক বন্ধুর কাছে যাওয়া। অন্যদিকে, লি ইংল্যান্ড থেকে বন্ধুদের নিয়ে সাইকেলে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভেস্তে যাওয়ায় তিনি বিমানে ভারত আসার সিদ্ধান্ত নেন। কাকতালীয়ভাবে তাঁদের দুজনের পথ এসে মিশেছিল অন্নপূর্ণার একটি ছোট্ট টি-হাউসে।

পাহাড়ি পথে দিনের পর দিন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতেই তাঁদের পরিচয় গভীর হয়। বরফগলা নদীর পাশ দিয়ে, ঝুলন্ত সেতু পেরিয়ে বা সরু পথ ধরে চলতে চলতে তাঁরা একে অপরের ভেতরের জগত উন্মোচন করেন। দেশের গল্প, পরিবারের কথা, স্বপ্ন, ভয় এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুই স্থান পায় তাঁদের কথোপকথনে। মজার ছলে ম্যান্ডি লি-কে শেখাচ্ছিলেন থাই ভাষার কিছু শব্দ, আর লি শেখাচ্ছিলেন স্প্যানিশ। ভালোবাসার কথা বলার প্রয়োজন হয়নি, কারণ কিছু অনুভূতি শব্দের বেড়া ভেঙে নিজেরাই পথ করে নেয়। পূর্ণিমার আলোয় তাঁদের প্রথম দেখা হয়েছিল ভ্যালেন্টাইনস ডেতে, আর কয়েকদিন পর তাতোপানির উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে পাহাড় আর নদীকে সাক্ষী রেখে তাঁরা প্রথম একে অপরকে চুম্বন করেন। এই স্মৃতিচারণার সময়ও ৩০ বছর পর লির চোখে সেই বিশেষ আলো স্পষ্ট ছিল, যা তাঁদের প্রেমের গভীরতা প্রমাণ করে।

এই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি আসে তাঁদের দেখা হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, যখন ম্যান্ডির পাসপোর্ট হারিয়ে যায়। নতুন পাসপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে কাঠমান্ডুতে অপেক্ষা করতে হয়, আর লি রওনা দেন এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের পথে। আজকের দিনে এটি হয়তো একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা বা ভিডিও কলের মাধ্যমে সমাধান করা যেত, কিন্তু ১৯৯৬ সালে ভালোবাসার একমাত্র ভাষা ছিল হাতে লেখা চিঠি। ম্যান্ডি এক রাতেই বারোটি চিঠি লেখেন এবং এভারেস্টগামী বাসে উঠে অচেনা ট্রেকারদের হাতে লি-র কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ জানান। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি চিঠিই লির কাছে পৌঁছেছিল এবং লি-ও উত্তর লিখেছিলেন, যা অন্য ট্রেকারদের হাত ধরে ফিরে এসেছিল ম্যান্ডির কাছে। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষগুলো বিনা পারিশ্রমিকে তাঁদের ভালোবাসার ডাকপিয়ন হয়ে উঠেছিলেন, যা মানবতাবোধের এক অনন্য নজির স্থাপন করে। এই চিঠিগুলোর কয়েকটি আজও তাঁরা সযত্নে রেখেছেন, যার পুরনো কাগজ হয়তো সময়ের সাক্ষ্য বহন করে, কিন্তু ভেতরের শব্দগুলো আজও অম্লান।

বাংলাদেশ ছিল তাঁদের ভ্রমণজীবনের ১২৭তম দেশ। প্রতিবেদকের কৌতূহল ছিল, কেন বাংলাদেশ? উত্তরে লি এক ভিন্ন ধরনের গল্প শোনান। তিনি স্মিত হেসে জানান যে, তাঁর জন্মদিন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস একই দিনে—২৬শে মার্চ। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মনে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে, যে দেশের জন্মদিন আর তাঁর জন্মদিন একই দিনে, একদিন সেই দেশটায় তাঁকে যেতেই হবে। এই ব্যক্তিগত সংযোগ প্রকৃতির টানে বা ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের চেয়েও গভীর এক মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করে। লি ও ম্যান্ডির ভ্রমণকাহিনী কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করার গল্প নয়, এটি মানুষের ভেতরের জগত আবিষ্কার এবং একে অপরের সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলার গল্প। তাঁদের দীর্ঘ এই যাত্রার সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি কোনো দর্শনীয় স্থান থেকে নয়, বরং একজন মানুষকে গভীরভাবে খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল, যা পৃথিবীর বুকে মানবতার অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ককে তুলে ধরে।