Hi

১১:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান টানাপোড়েন: কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হবে?

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ০৮:২২:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ১২ জন দেখেছে

বিশ্ব ভূরাজনীতির অন্যতম সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। তবে এই সমঝোতার পথ কতটা সুগম হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার মাঝে এটি আদৌ স্থায়ী রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে। চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো বেশ জটিল ও পরিবর্তনশীল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি সম্ভাব্য চুক্তি অত্যন্ত কাছাকাছি চলে এসেছে। এমনকি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তেহরানের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সঙ্গে কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়ে রেখেছেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসনের এই মিশ্র ও চাপ প্রয়োগকারী নীতির কারণে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক গবেষকরা।

অন্যদিকে, তেহরান শুরু থেকেই স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তারা কেবল ওমানের মধ্যস্থতায় একটি সীমিত ও অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন যে, ওমান ও ইরানের প্রতিনিধিরা একটি নিরাপদ নৌপথের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নির্ধারণে প্রাথমিক ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, কোনো তৃতীয় পক্ষ বা বহিরাগত শক্তি যদি এই প্রক্রিয়ায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করে, তবে পুরো উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এই আলোচনার সাফল্য নিয়ে ৫০-৫০ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সরাসরি প্রতিনিধিত্ব না থাকায় চূড়ান্ত সমঝোতা বাস্তবায়নে আইনি ও কাঠামোগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ইরানি গণমাধ্যমগুলোর দাবি, ওমানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরে বিলম্বের মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাঠানো পরস্পরবিরোধী সংকেত এবং ধারাবাহিক হুমকি। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম ও ফার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা পর্দার অন্তরালে থেকে আলোচনার গতি শ্লথ করার চেষ্টা করছে। তেহরান এমন একটি মধ্যবর্তী করিডর প্রতিষ্ঠা করতে চায় যা ওমানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে প্রশমিত করার পাশাপাশি ইরানের সার্বভৌম অধিকার এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করবে। তবে এই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ওয়াশিংটন, আবুধাবি এবং রিয়াদের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের পরিপন্থী এবং তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।

কুয়িনসি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি মনে করেন, তেহরান মূলত আঞ্চলিক সংঘাতে অর্জিত ভূকৌশলগত প্রভাবকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত বা সরকার পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প এড়িয়ে মার্কিন প্রশাসন এখন একটি বাস্তবসম্মত কিন্তু কঠিন কূটনৈতিক আপসের পথ খুঁজছে। তবে চুক্তি অধরা থাকায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ওপর এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়া হলেও বৈশ্বিক বাজারে তেলের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে এবং মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১৮ মাস সময় লেগে যেতে পারে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কূটনীতির ওপরই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপরও গভীরভাবে নির্ভর করছে।

জনপ্রিয়

গুগল ক্লাসরুমে আসছে জেমিনাই এআই: শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা হবে আরও সহজ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান টানাপোড়েন: কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হবে?

আপডেট : ০৮:২২:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্ব ভূরাজনীতির অন্যতম সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। তবে এই সমঝোতার পথ কতটা সুগম হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার মাঝে এটি আদৌ স্থায়ী রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে। চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো বেশ জটিল ও পরিবর্তনশীল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি সম্ভাব্য চুক্তি অত্যন্ত কাছাকাছি চলে এসেছে। এমনকি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তেহরানের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সঙ্গে কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়ে রেখেছেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসনের এই মিশ্র ও চাপ প্রয়োগকারী নীতির কারণে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক গবেষকরা।

অন্যদিকে, তেহরান শুরু থেকেই স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তারা কেবল ওমানের মধ্যস্থতায় একটি সীমিত ও অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন যে, ওমান ও ইরানের প্রতিনিধিরা একটি নিরাপদ নৌপথের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নির্ধারণে প্রাথমিক ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, কোনো তৃতীয় পক্ষ বা বহিরাগত শক্তি যদি এই প্রক্রিয়ায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করে, তবে পুরো উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এই আলোচনার সাফল্য নিয়ে ৫০-৫০ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সরাসরি প্রতিনিধিত্ব না থাকায় চূড়ান্ত সমঝোতা বাস্তবায়নে আইনি ও কাঠামোগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ইরানি গণমাধ্যমগুলোর দাবি, ওমানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরে বিলম্বের মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাঠানো পরস্পরবিরোধী সংকেত এবং ধারাবাহিক হুমকি। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম ও ফার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা পর্দার অন্তরালে থেকে আলোচনার গতি শ্লথ করার চেষ্টা করছে। তেহরান এমন একটি মধ্যবর্তী করিডর প্রতিষ্ঠা করতে চায় যা ওমানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে প্রশমিত করার পাশাপাশি ইরানের সার্বভৌম অধিকার এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করবে। তবে এই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ওয়াশিংটন, আবুধাবি এবং রিয়াদের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের পরিপন্থী এবং তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।

কুয়িনসি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি মনে করেন, তেহরান মূলত আঞ্চলিক সংঘাতে অর্জিত ভূকৌশলগত প্রভাবকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত বা সরকার পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প এড়িয়ে মার্কিন প্রশাসন এখন একটি বাস্তবসম্মত কিন্তু কঠিন কূটনৈতিক আপসের পথ খুঁজছে। তবে চুক্তি অধরা থাকায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ওপর এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়া হলেও বৈশ্বিক বাজারে তেলের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে এবং মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১৮ মাস সময় লেগে যেতে পারে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কূটনীতির ওপরই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপরও গভীরভাবে নির্ভর করছে।