মহাকাশ ও ভিনগ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের প্রতিযোগিতা নিয়ে বেশ কয়েক দশক ধরে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে এবার লাল গ্রহ কিংবা চাঁদের পাশাপাশি পৃথিবীর বুকেই শুরু হয়েছে এক নতুন ও রোমাঞ্চকর লড়াই—সমুদ্রের তলদেশে মানবের বসবাস উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। বিশ্বজুড়ে একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থা বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে এই খাতে মাঠে নেমেছে। এই ধারায় নতুন এক বড় সাফল্য অর্জন করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মহাসাগর গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ডিপ’ (DEEP)। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পানির নিচে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের বসবাসের জন্য ‘ভ্যানগার্ড’ নামের একটি অত্যাধুনিক আন্ডারওয়াটার স্টেশন বা বাসস্থান তৈরি করে তা সফলভাবে স্থাপন করেছে। ফ্লোরিডা কিজ ন্যাশনাল মেরিন স্যাঙ্কচুয়ারির প্রায় ৫৬ ফুট গভীরে এটি বসানো হয়েছে, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে মার্কিন জলসীমায় বসানো প্রথম গভীর সমুদ্র মানব বাসস্থান।
সমুদ্রের তলদেশে গবেষণাগার ও মানব বাসস্থান তৈরির প্রচেষ্টা একেবারেই নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশকে বিখ্যাত ফরাসি মহাসাগর গবেষক জাক-ইভ কুস্তো তাঁর ঐতিহাসিক ‘কনশেল্ফ’ (Conshelf) অভিযানের মাধ্যমে পানির নিচে মানুষের বসবাসের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। তবে কারিগরি জটিলতা, তীব্র চাপ এবং বিপুল খরচের কারণে সেই উদ্যোগগুলো একপর্যায়ে থমকে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে মার্কিন জলসীমায় ‘অ্যাকোয়ারিয়াস’ নামের একটি সমুদ্রতল গবেষণা স্টেশন চালু হয়, যা দীর্ঘদিন গবেষকদের সেবা দিয়ে আসছে। অ্যাকোয়ারিয়াসের প্রায় তিন দশক পর ‘ভ্যানগার্ড’ যুক্ত হয়ে আন্ডারওয়াটার সায়েন্স ও গবেষণার জগতে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করল।
কারিগরি দিক থেকে ‘ভ্যানগার্ড’ একটি উচ্চমানের প্রকৌশল নিদর্শন। প্রায় ৩৫ ফুট দীর্ঘ এবং ৮ ফুট চওড়া এই স্টেশনটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো অত্যন্ত সুসংগঠিত। এখানে একসঙ্গে চারজন গবেষক বা ‘অ্যাকোয়ানট’ টানা এক সপ্তাহ অবস্থান করে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা চালাতে পারবেন। স্টেশনের ভেতরে অবস্থানকারীদের শ্বসনপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সমুদ্রের ওপরে ভাসমান একটি বিশেষ বয়ার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তাজা বাতাস সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সাথে এই বয়াটি স্টেশনের বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং যোগাযোগ রক্ষা করার মূল উৎস হিসেবে কাজ করে।
বিজ্ঞানীরা জানান, ‘ভ্যানগার্ড’ স্টেশনের ব্যবহার কেবল সামুদ্রিক জীববিদ্যার গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থার নভোচারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ। পানির নিচের পরিবেশ ও মহাশূন্যের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে অনেক সামঞ্জস্য থাকায় এটিকে নভোচারীদের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির আদর্শ ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হচ্ছে। এছাড়া সামরিক প্রশিক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ, শিক্ষা কার্যক্রম এবং গভীর সমুদ্র প্রযুক্তির মানোন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
রিপোর্টার নাম: 




















