শিক্ষাজীবন প্রতিটি মানুষের জীবনে এক অনন্য ও আবেগঘন অধ্যায় নিয়ে আসে। সময়ের পরিক্রমায় সেই শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলো কীভাবে চোখের পলকে পার হয়ে যায়, তা যেন টেরই পাওয়া যায় না। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেটে যাওয়া দীর্ঘ এক দশকের এমনই এক আবেগময় স্মৃতিকথা ফুটিয়ে তুলেছেন এক তরুণ এসএসসি পরীক্ষার্থী। ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি রাউজান স্টেশন মডেল সরকারি প্রাইমারি স্কুলে শিশু শ্রেণಿಯಲ್ಲಿ পদার্পণের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছিল, তা আজ সমাপ্তির পথে।
শৈশবের সেই দিনগুলোতে প্রথম যখন বাবার হাত ধরে অপরিচিত পরিবেশে প্রবেশ করেছিলেন এই শিক্ষার্থী, তখন মনে একধরনের অজানা আতঙ্ক ও নার্ভাসনেস কাজ করত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অপরিচিত মুখগুলোই একসময় প্রিয় বন্ধু ও আপনজনে পরিণত হয়। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষালয়ের আঙিনা মুখরিত ছিল সহপাঠীদের কলকাকলিতে। কিন্তু ছন্দপতন ঘটে পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর পরই। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। গৃহবন্দী সেই দিনগুলোতে চার দেয়ালের মাঝে কেটেছে অলস সময়, ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ।
মহামারির সেই কঠিন সময় পেরিয়ে লটারির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাউজান আর আর এসি মডেল সরকারি হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন এই শিক্ষার্থী। নতুন পরিবেশে সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। ক্লাসের প্রায় সবাই ছিল অচেনা। তবে দীর্ঘকাল ধরে চলা ক্লাসের রুটিন ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের কল্যাণে সেই অচেনা মুখগুলোই দ্রুত প্রিয় বন্ধুতে রূপ নেয়। এই পথচলায় গড়ে ওঠে সাত সদস্যের একটি অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের দল। জীবনের নানা ছোটখাটো আনন্দ, টিফিনের আড্ডা আর স্কুলজীবনের সোনালী মুহূর্তগুলো এই বন্ধুদের ঘিরেই আবর্তিত হতো।
স্কুলজীবনের শেষ প্রান্তে এসে পেছনে তাকালে ভেসে ওঠে অজস্র মধুর স্মৃতি। পিটি প্যারেডে অংশ নেওয়া, জাতীয় সংগীত গাওয়া, জীববিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যালের জন্য দল বেঁধে জবা ফুল সংগ্রহ এবং তা থেকে পাপড়ি আলাদা করার তুমুল প্রতিযোগিতা—সবকিছুই আজ অতীত। ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে লুকিয়ে টিফিন খাওয়া কিংবা ফিজিকস স্যারের কড়া নজর এড়িয়ে প্র্যাকটিক্যালের খাতার জন্য নিখুঁত চিত্র আঁকার চেষ্টা—এই ছোটখাটো ভয় ও আনন্দের মিশ্রণই কৈশোরকে করে তুলেছে বর্ণিল। একসময় প্রতিদিন ভোরে কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাওয়া এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা বেশ বিরক্তির কারণ মনে হলেও, আজ সেই বিরক্তিকর রুটিনগুলোকেই সবচেয়ে বেশি মিস করছেন এই তরুণ শিক্ষার্থী।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জীবনের এই ক্ষণস্থায়ী স্কুলজীবন মানুষের মানসিক গঠন এবং নৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং যান্ত্রিক জীবনযাত্রার মাঝেও এই ধরনের আবেগঘন স্মৃতিকথা তরুণ প্রজন্মের পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। সময়ের স্রোতে জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলতেই থাকে, কিন্তু শৈশব ও কৈশোরের এই নির্মল স্মৃতিগুলো মানুষের হৃদয়ের গভীরে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকে। রাউজানের এই শিক্ষার্থীর এক দশকের স্কুলজীবনের ইতি ঘটার মধ্য দিয়ে কেবল একটি পরীক্ষার প্রস্তুতিই শেষ হচ্ছে না, বরং সমাপ্তি ঘটছে জীবনের এক সোনালী অধ্যায়ের।
রিপোর্টার নাম: 
























