Hi

০৫:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই ভাইয়ের করুণ মৃত্যু: কফিনে ফিরল স্বপ্ন, লক্ষ্মীপুরে শোকের মাতম

পরিবারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনা ও জমিজমার ধারদেনা শোধ করার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের দুই ভাই। তবে প্রবাস জীবনের সেই রঙিন স্বপ্ন নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনায়। দেশটির দাম্মাম শহরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর পর শেষ পর্যন্ত কাঠের কফিনে বন্দি হয়ে নিজ ভিটায় ফিরতে হলো তাঁদের। লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামে একসঙ্গে দুই ভাইয়ের মরদেহ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় এবং স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

নিহত দুই প্রবাসী হলেন চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের খলিফার বাড়ির বাসিন্দা আবদুল মালেকের বড় ছেলে ফয়েজ আহমেদ সজীব (২৯) ও ছোট ছেলে ফরহাদ হোসেন সুজন (২১)। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বড় ভাই সজীব দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের দাম্মাম এলাকায় খেজুর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে এবং নিজের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চলতি বছরের প্রথম দিকে তিনি ছোট ভাই সুজনকেও নিজের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু ভাগ্য তাঁদের বেশিদিন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেয়নি। গত ১৫ জুলাই রাতে একটি খেজুরবোঝাই পিকআপ ভ্যানে করে বাগান থেকে ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাক-লরির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।

বিদেশে আইনি প্রক্রিয়া ও লাশ দেশে আনার আনুষঙ্গিক দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগে যায়। সব প্রক্রিয়া শেষে সোমবার রাতে দুই ভাইয়ের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। প্রিয়জনদের শেষবারের মতো একনজর দেখতে গভীর রাতেও শত শত মানুষ তাঁদের বাড়িতে ভিড় জমান। পরদিন মঙ্গলবার সকালে গনিপুর গ্রামের কামারহাট মসজিদ মাঠে যৌথভাবে তাঁদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে পারিবারিক কবরস্থানে দুই ভাইকে পাশাপাশি সমাহিত করা হয়।

দুই ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা আবদুল মালেক। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে ছেলেদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন ছেলেরা পরিশ্রম করে সংসারের অভাব ঘোচাবে এবং মাথার ওপর চেপে থাকা ঋণের বোঝা হালকা করবে। কিন্তু ঋণ শোধ হওয়ার আগেই দুই সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি এখন অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। নিহত বড় ভাই সজীবের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। সংসারের মূল উপার্জনক্ষম দুই সদস্যকে হারিয়ে এই পরিবারটি এখন চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছে।

ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, সজীব ও সুজন দুজনেই অত্যন্ত শান্ত, পরিশ্রমী ও এলাকার সবার প্রিয় ছিলেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এই দুই প্রবাসীর এমন অকালমৃত্যু পুরো গনিপুর গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রতিদিন কর্মসংস্থানের তাগিদে যাওয়া বহু প্রবাসী বাংলাদেশি এভাবে প্রবাসী ভূমিতে প্রাণ হারাচ্ছেন, যা তাঁদের পরিবারগুলোর জন্য চিরতরে বয়ে আনছে অপূরণীয় ক্ষতি।

জনপ্রিয়

মিরপুরে টিসিবির পণ্য কেনার সারিতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: দেয়াল ধসে নিহত ২, আহত ৮

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই ভাইয়ের করুণ মৃত্যু: কফিনে ফিরল স্বপ্ন, লক্ষ্মীপুরে শোকের মাতম

আপডেট : ০৪:২৪:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

পরিবারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনা ও জমিজমার ধারদেনা শোধ করার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন লক্ষ্মীপুরের দুই ভাই। তবে প্রবাস জীবনের সেই রঙিন স্বপ্ন নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনায়। দেশটির দাম্মাম শহরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর পর শেষ পর্যন্ত কাঠের কফিনে বন্দি হয়ে নিজ ভিটায় ফিরতে হলো তাঁদের। লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামে একসঙ্গে দুই ভাইয়ের মরদেহ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় এবং স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

নিহত দুই প্রবাসী হলেন চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার গনিপুর গ্রামের খলিফার বাড়ির বাসিন্দা আবদুল মালেকের বড় ছেলে ফয়েজ আহমেদ সজীব (২৯) ও ছোট ছেলে ফরহাদ হোসেন সুজন (২১)। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বড় ভাই সজীব দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের দাম্মাম এলাকায় খেজুর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে এবং নিজের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চলতি বছরের প্রথম দিকে তিনি ছোট ভাই সুজনকেও নিজের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু ভাগ্য তাঁদের বেশিদিন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেয়নি। গত ১৫ জুলাই রাতে একটি খেজুরবোঝাই পিকআপ ভ্যানে করে বাগান থেকে ফেরার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাক-লরির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।

বিদেশে আইনি প্রক্রিয়া ও লাশ দেশে আনার আনুষঙ্গিক দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগে যায়। সব প্রক্রিয়া শেষে সোমবার রাতে দুই ভাইয়ের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। প্রিয়জনদের শেষবারের মতো একনজর দেখতে গভীর রাতেও শত শত মানুষ তাঁদের বাড়িতে ভিড় জমান। পরদিন মঙ্গলবার সকালে গনিপুর গ্রামের কামারহাট মসজিদ মাঠে যৌথভাবে তাঁদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে পারিবারিক কবরস্থানে দুই ভাইকে পাশাপাশি সমাহিত করা হয়।

দুই ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা আবদুল মালেক। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে ছেলেদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন ছেলেরা পরিশ্রম করে সংসারের অভাব ঘোচাবে এবং মাথার ওপর চেপে থাকা ঋণের বোঝা হালকা করবে। কিন্তু ঋণ শোধ হওয়ার আগেই দুই সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি এখন অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। নিহত বড় ভাই সজীবের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। সংসারের মূল উপার্জনক্ষম দুই সদস্যকে হারিয়ে এই পরিবারটি এখন চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছে।

ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন নিপা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, সজীব ও সুজন দুজনেই অত্যন্ত শান্ত, পরিশ্রমী ও এলাকার সবার প্রিয় ছিলেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এই দুই প্রবাসীর এমন অকালমৃত্যু পুরো গনিপুর গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রতিদিন কর্মসংস্থানের তাগিদে যাওয়া বহু প্রবাসী বাংলাদেশি এভাবে প্রবাসী ভূমিতে প্রাণ হারাচ্ছেন, যা তাঁদের পরিবারগুলোর জন্য চিরতরে বয়ে আনছে অপূরণীয় ক্ষতি।