বঙ্গোপসাগরে প্রায় এক মাস ধরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসমান অবস্থায় থাকা শ্রীলঙ্কার দুই নাগরিককে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ঢাকার একটি নিরাপদ আশ্রয়ে (সেফ হোম) পাঠানো হয়েছে। আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে তাঁদের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে রাজধানীর উদ্দেশে রওনা করানো হয়। এর আগে, সাগরের বুকে চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে থাকা এই দুই বিদেশি জেলের উদ্ধার এবং পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উদ্ধার হওয়া এই দুই শ্রীলঙ্কান নাগরিক হলেন এস এইচ চামিন্দা (৫১) এবং তাঁর তরুণ ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং (৩০)। তাঁরা উভয়েই শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডের বাসিন্দা এবং পেশায় সামুদ্রিক মৎস্যজীবী। গত ৩৬ দিন আগে তাঁরা একটি ছোট ট্রলার নিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটির উপকূলীয় অঞ্চল থেকে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে গভীর সাগরে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ করে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে তাঁদের ট্রলারের ইঞ্জিন সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রলারটি ভাসতে ভাসতে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলে যায়।
প্রাথমিক দুর্বিপাকের পর তাঁদের সঙ্গে থাকা অন্য দুই সহকর্মী আরেকটি মাছ ধরার নৌকার সহায়তায় নিরাপদে শ্রীলঙ্কায় ফিরে যেতে সক্ষম হলেও, ট্রলারের মালিকানা নিজেদের হওয়ায় বাবা-ছেলে ওই ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানটিতেই রয়ে যান। এর কিছুদিন পর মাঝসাগরে মিয়ানমার উপকূলীয় এলাকার কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি তাঁদের ট্রলারে হানা দেয় এবং তাঁদের কাছে থাকা দুরবিন, ক্যামেরা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। এতে তাঁরা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েন। বিপদের মাত্রা এমন একপর্যায়ে পৌঁছায় যে, যাত্রা শুরুর মাত্র সাত দিনের মাথায় তাঁদের সঙ্গে থাকা সমস্ত খাবার ও সুপেয় পানির মজুত ফুরিয়ে যায়।
খাবারের অভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও চামিন্দা ও তাঁর ছেলে হার মানেননি। দীর্ঘ ২৯ দিন ধরে তাঁরা ট্রলারে থাকা বড়শির টোপ এবং সমুদ্র থেকে বিভিন্ন উপায়ে ধরা কাঁচা মাছ খেয়ে জীবনধারণ করেন। এভাবে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সাগরের ঢেউয়ের ওপর ভাসতে ভাসতে গত সপ্তাহে তাঁরা বাংলাদেশের জলসীমায় মহেশখালী উপকূলের কাছাকাছি এসে পৌঁছান। ঠিক সেই মুহূর্তে স্থানীয় বাংলাদেশি মৎস্যজীবী জিয়াউর রহমানের একটি ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারের সময় ভাসমান ওই নৌযানটিকে দেখতে পায়। বাংলাদেশি জেলেরা কাছে গিয়ে দেখতে পান, শ্রীলঙ্কান বাবা-ছেলে আশঙ্কাজনক ও অসহায় অবস্থায় হাতজোড় করে সাহায্যের আকুতি জানাচ্ছেন।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশি জেলেরা কালক্ষেপণ না করে তাঁদের নিজেদের ট্রলারে তুলে নেন এবং রশি দিয়ে বেঁধে ওই ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ট্রলারটিসহ গত শুক্রবার রাতে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নে জিয়াউর রহমানের বাড়িতে নিয়ে আসেন। ভাষা না জানার কারণে প্রথমে স্থানীয়দের বুঝতে সমস্যা হলেও, জিয়াউর রহমানের দুবাইপ্রবাসী এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় ভিডিও কলের মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় এবং সম্পূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়। এরপর বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হলে পুলিশ এসে তাঁদের হেফাজতে নেয়।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সুলতান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত দুই দিনে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শ্রীলঙ্কার বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে দুই জেলের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়। এরপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁদের মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাঁদের নিজ দেশে নিরাপদে প্রত্যাবাসন না করা পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ঢাকার একটি সেফ হোমে রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের পরই তাঁদের সড়কপথে ঢাকায় স্থানান্তর করা হচ্ছে, যেখান থেকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে তাঁদের নিজ দেশে পাঠানো হবে।
এদিকে, উদ্ধার করা ট্রলারটি হাজার হাজার কিলোমিটার উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শ্রীলঙ্কায় ফেরত পাঠানো অসম্ভব হওয়ায় আদালত সেটি স্থানীয় উদ্ধারকারী জেলের মালিক জিয়াউর রহমানকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গভীর সমুদ্র থেকে চরম ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারটি উপকূলীয় এলাকায় টেনে এনে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় স্থানীয় সচেতন মহল জিয়াউর রহমান ও তাঁর দলের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। এই ঘটনা বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার সুসম্পর্ক এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মানবিক হৃদয়ের আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিনিধি 
























