ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর’ অর্জনের দৌড়ে দলীয় সাফল্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণত কোনো বড় টুর্নামেন্ট বা ঘরোয়া লিগ জয়ী দলের তারকারাই এই খেতাবে ভূষিত হন। তবে ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ রয়েছে, যেখানে দলীয় কোনো প্রধান শিরোপা না জিতেও কেবল দুর্দান্ত ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সুবাদে খেলোয়াড়রা এই মুকুট পরেছেন। বর্তমান সময়ে ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের রিয়াল মাদ্রিদ ও জাতীয় দলের হয়ে কোনো বড় ট্রফি না জেতার পরেও ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় আসার প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলো নতুন করে সামনে চলে এসেছে।
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নব্বই দশকের পর থেকে বড় কোনো দলীয় ট্রফি ছাড়াই ব্যালন ডি’অর অর্জনের এমন ঘটনা ঘটেছে তিনবার। যার প্রথমটি ঘটেছিল ১৯৯৫ সালে। সে বছর লাইবেরিয়ার তরুণ স্ট্রাইকার জর্জ উইয়াহ প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) জার্সিতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি দলকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেন। পিএসজি সে মৌসুমে ঘরোয়া কাপ জিতলেও কোনো লিগ শিরোপা বা ইউরোপিয়ান ট্রফি নিজেদের করে নিতে পারেনি। তা সত্ত্বেও, বছরের শেষ দিকে জর্জ উইয়াহ প্রথম অ-ইউরোপীয় এবং প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জয় করেন, যা ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
এই ধারার দ্বিতীয় বড় উদাহরণটি দেখা যায় ২০০০ সালে। তৎকালীন বার্সেলোনার প্রাণভোমরা ও পর্তুগিজ মিডফিল্ডার লুইস ফিগো ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে মাঠে অসাধারণ ফুটবল উপহার দেন। লা লিগায় ক্যাতালোান জায়ান্টদের হয়ে তাঁর গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা ছিল ঈর্ষণীয়। এমনকি ইউরো ২০০০-এ পর্তুগালকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান তিনি। তবে সেই মৌসুমে বার্সেলোনা বা পর্তুগালের হয়ে কোনো প্রধান শিরোপা জিততে পারেননি ফিগো। এর মাঝেই রিয়াল মাদ্রিদে রেকর্ড ট্রান্সফারে যোগ দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিলেও, ডিসেম্বরে জিনেদিন জিদানকে পেছনে ফেলে তিনি ব্যালন ডি’অর জিতে নেন।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ২০১৩ সালে। বায়ার্ন মিউনিখ ওই বছর ট্রেবল জয়ের ইতিহাস গড়লেও এবং ফ্রেঞ্চ উইঙ্গার ফ্রাংক রিবেরি সম্ভাব্য সব শিরোপা অর্জন করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর জেতেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সে বছর রিয়াল মাদ্রিদ কোনো ট্রফি জিততে না পারলেও রোনালদো ব্যক্তিগতভাবে ৬৯ গোল করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। রিবেরির তীব্র ক্ষোভ সত্ত্বেও কেবল অবিশ্বাস্য গোলের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে রোনালদোর হাতেই উঠেছিল সেই ট্রফি।
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কিলিয়ান এমবাপ্পের অবস্থাও অনেকটা এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলোর কাছাকাছি। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে মৌসুম কাটানোর পর তাঁর ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান বেশ সমৃদ্ধ। লা লিগায় গোল করে পিচিচি ট্রফি জয় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া সত্ত্বেও রিয়াল মাদ্রিদ দলগতভাবে বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি। অন্যদিকে, জাতীয় দলের জার্সিতেও বিশ্বকাপ বাছাই কিংবা মূল পর্বে ব্যক্তিগত সাফল্য পেলেও ফ্রান্স দলগতভাবে শিরোপা থেকে দূরে থাকে। তবে তিনটি ভিন্ন প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার এই অনন্য কৃতিত্ব ব্যালন ডি’অরের দৌলতে তাঁর পক্ষে কতটা কাজ করবে, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। ট্রফি না জিতেও ব্যালন ডি’অর অর্জনের এই অতীত ইতিহাস এমবাপ্পের ভক্তদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রিপোর্টার নাম: 






















