Hi

০৮:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়: যেভাবে এসেছিল হজরত নুহ (আ.)-এর আমলের মহাপ্লাবন

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্ব চলে আসছে। ইতিহাসের পাতায় বহু অবাধ্য জাতির ধ্বংসলীলার কথা বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে হজরত নুহ (আ.)-এর যুগের মহাপ্লাবন অন্যতম একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর ইন্তেকালের দীর্ঘকাল পর মানুষ যখন একত্ববাদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নানা কুসংস্কার ও মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত হয়, তখন সৃষ্টিকর্তা তাদের সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য নুহ (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। দীর্ঘ সাড়ে ৯৫০ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তাঁর জাতিকে তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। কিন্তু সমাজের প্রভাবশালী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁর এই দাওয়াতকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর অনুসারী নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষকে নিয়ে নানা উপহাস ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন সমাজে ‘ওয়াদ’, ‘সুওয়া’, ‘ইয়াগুস’, ‘ইয়াউক’ ও ‘নাসর’ নামের বেশ কয়েকজন পুণ্যবান ব্যক্তির মৃত্যুর পর শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে মূর্তি নির্মাণ শুরু করে। ক্রমান্বয়ে সেই মূর্তিগুলোরই উপাসনা শুরু হয়, যা মানবসমাজে প্রথম শিরক বা বহু ঈশ্বরবাদের সূচনা করে। নুহ (আ.) দিনের পর দিন, রাতে ও গোপনে মানুষদের আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করেন এবং তওবা করলে ক্ষমা ও প্রাচুর্যের সুসংবাদ দেন। তা সত্ত্বেও, গোত্রপ্রধানরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে থাকে এবং নবীকে সাধারণ একজন মানুষ বলে অবজ্ঞা করে। একপর্যায়ে দীর্ঘ শতাব্দী ধরে দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন অবাধ্য জাতি কোনোভাবেই সৎপথে ফিরে আসেনি এবং নবীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত বাড়াতে থাকে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর নিশ্চিত শাস্তির ফয়সালা অবধারিত হয়।

শাস্তির এই মহাপ্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালে আল্লাহ তাআলা নুহ (আ.)-কে ওহির মাধ্যমে একটি বিশাল নৌকা নির্মাণের নির্দেশ দেন। এমন একটি স্থানে যেখানে কোনো নদী বা সমুদ্রের অস্তিত্ব ছিল না, সেখানে এই নৌকা নির্মাণ ছিল স্থানীয়দের জন্য চরম বিস্ময়কর ও বিদ্রূপের বিষয়। তবে এর পেছনে গভীর আত্মিক শিক্ষা নিহিত ছিল—আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা করার অর্থ অলস বসে থাকা নয়, বরং সাধ্যমতো উপায়-উপকরণ অবলম্বন করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। নৌকা নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর যখন তান্নুর বা চুল্লি থেকে পানি উথলে উঠতে শুরু করল, তখনই শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক মহাপ্লাবন। আকাশ থেকে মুষলধারে অঝোর ধারায় বৃষ্টিপাত এবং পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে পানির ফোয়ারা একসঙ্গে প্রকম্পিত করে তোলে সমগ্র ভূখণ্ডকে।

মহা এই প্লাবনের সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়, যখন নুহ (আ.) তাঁর অবাধ্য সন্তানকে আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচানোর জন্য নৌকায় ওঠার শেষ আহ্বান জানান। কিন্তু সেই সন্তান পিতার কথা অমান্য করে পাহাড়ের উঁচুতে আশ্রয় নেওয়ার অহংকার করে এবং পানির প্রবল ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বংশ বা রক্ত সম্পর্কের চেয়ে ইমান বা বিশ্বাসই মানুষের প্রকৃত মুক্তির একমাত্র মাধ্যম। নির্দিষ্ট সময় পর আল্লাহর আদেশে পৃথিবী পানি শোষণ করে নেয় এবং আকাশ বৃষ্টি থামালে নবী ও মুমিনদের বহনকারী ঐতিহাসিক নৌকাটি জুদি পর্বতের চূড়ায় নিরাপদে স্থির হয়। মহাপ্লাবনের এই ধ্বংসযজ্ঞের পর নুহ (আ.) ও তাঁর সঙ্গী মুমিনদের হাত ধরেই পৃথিবীতে নতুনভাবে মানব সভ্যতার বিস্তার ঘটে, যে কারণে ধর্মীয় ইতিহাসবিদ ও মুফাসসিরগণ তাঁকে ‘মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

জনপ্রিয়

অবশেষে গুঞ্জন সত্যি হলো: ফ্রান্সের নতুন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিলেন জিনেদিন জিদান

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়: যেভাবে এসেছিল হজরত নুহ (আ.)-এর আমলের মহাপ্লাবন

আপডেট : ০৬:৪২:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্ব চলে আসছে। ইতিহাসের পাতায় বহু অবাধ্য জাতির ধ্বংসলীলার কথা বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে হজরত নুহ (আ.)-এর যুগের মহাপ্লাবন অন্যতম একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর ইন্তেকালের দীর্ঘকাল পর মানুষ যখন একত্ববাদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নানা কুসংস্কার ও মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত হয়, তখন সৃষ্টিকর্তা তাদের সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য নুহ (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। দীর্ঘ সাড়ে ৯৫০ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তাঁর জাতিকে তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। কিন্তু সমাজের প্রভাবশালী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁর এই দাওয়াতকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর অনুসারী নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষকে নিয়ে নানা উপহাস ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন সমাজে ‘ওয়াদ’, ‘সুওয়া’, ‘ইয়াগুস’, ‘ইয়াউক’ ও ‘নাসর’ নামের বেশ কয়েকজন পুণ্যবান ব্যক্তির মৃত্যুর পর শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে মূর্তি নির্মাণ শুরু করে। ক্রমান্বয়ে সেই মূর্তিগুলোরই উপাসনা শুরু হয়, যা মানবসমাজে প্রথম শিরক বা বহু ঈশ্বরবাদের সূচনা করে। নুহ (আ.) দিনের পর দিন, রাতে ও গোপনে মানুষদের আল্লাহর শাস্তি থেকে সতর্ক করেন এবং তওবা করলে ক্ষমা ও প্রাচুর্যের সুসংবাদ দেন। তা সত্ত্বেও, গোত্রপ্রধানরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে থাকে এবং নবীকে সাধারণ একজন মানুষ বলে অবজ্ঞা করে। একপর্যায়ে দীর্ঘ শতাব্দী ধরে দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন অবাধ্য জাতি কোনোভাবেই সৎপথে ফিরে আসেনি এবং নবীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত বাড়াতে থাকে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর নিশ্চিত শাস্তির ফয়সালা অবধারিত হয়।

শাস্তির এই মহাপ্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালে আল্লাহ তাআলা নুহ (আ.)-কে ওহির মাধ্যমে একটি বিশাল নৌকা নির্মাণের নির্দেশ দেন। এমন একটি স্থানে যেখানে কোনো নদী বা সমুদ্রের অস্তিত্ব ছিল না, সেখানে এই নৌকা নির্মাণ ছিল স্থানীয়দের জন্য চরম বিস্ময়কর ও বিদ্রূপের বিষয়। তবে এর পেছনে গভীর আত্মিক শিক্ষা নিহিত ছিল—আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা করার অর্থ অলস বসে থাকা নয়, বরং সাধ্যমতো উপায়-উপকরণ অবলম্বন করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। নৌকা নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর যখন তান্নুর বা চুল্লি থেকে পানি উথলে উঠতে শুরু করল, তখনই শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক মহাপ্লাবন। আকাশ থেকে মুষলধারে অঝোর ধারায় বৃষ্টিপাত এবং পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে পানির ফোয়ারা একসঙ্গে প্রকম্পিত করে তোলে সমগ্র ভূখণ্ডকে।

মহা এই প্লাবনের সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়, যখন নুহ (আ.) তাঁর অবাধ্য সন্তানকে আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচানোর জন্য নৌকায় ওঠার শেষ আহ্বান জানান। কিন্তু সেই সন্তান পিতার কথা অমান্য করে পাহাড়ের উঁচুতে আশ্রয় নেওয়ার অহংকার করে এবং পানির প্রবল ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বংশ বা রক্ত সম্পর্কের চেয়ে ইমান বা বিশ্বাসই মানুষের প্রকৃত মুক্তির একমাত্র মাধ্যম। নির্দিষ্ট সময় পর আল্লাহর আদেশে পৃথিবী পানি শোষণ করে নেয় এবং আকাশ বৃষ্টি থামালে নবী ও মুমিনদের বহনকারী ঐতিহাসিক নৌকাটি জুদি পর্বতের চূড়ায় নিরাপদে স্থির হয়। মহাপ্লাবনের এই ধ্বংসযজ্ঞের পর নুহ (আ.) ও তাঁর সঙ্গী মুমিনদের হাত ধরেই পৃথিবীতে নতুনভাবে মানব সভ্যতার বিস্তার ঘটে, যে কারণে ধর্মীয় ইতিহাসবিদ ও মুফাসসিরগণ তাঁকে ‘মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।