বাংলাদেশের ফ্যাশন এখন আর দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশীয় ডিজাইনাররা নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। এই শিল্পের সামগ্রিক পরিবর্তন, বিনিয়োগের প্রভাব এবং তাঁত ও কারুশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন ডিজাইনার মাহীন খান। কথোপকথনের এই পর্যায়ে তিনি জানান, দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অনেকটা এগিয়েছে এবং নতুনরা সৃজনশীল ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে এখনো রয়ে গেছে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব, বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াই অত্যন্ত কঠিন। করোনার সময় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সবাই বড় ধাক্কা খেয়েছিল। অনেকের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকে ভাড়া দিতে পারেননি বা কাজ বন্ধ করতে হয়েছে। বড় পরিসরে দোকান ও বাজার তৈরি হচ্ছে। একটি শিল্পের সঙ্গে তার ভৌগোলিক পরিচয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
মাহীন খান স্মরণ করেন, করোনা মহামারির সময় পুরো ইন্ডাস্ট্রি এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উদ্যোক্তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর খুচরা বাজারে বড় ধরনের বিনিয়োগ দেশীয় ক্ষুদ্র কারুশিল্পের জন্য কিছুটা আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, তাঁত, নকশিকাঁথা ও হাতের তৈরি কাজের ক্ষেত্রে ছোট উদ্যোক্তারা যে গবেষণা বা সময় ব্যয় করেন, বড় বড় মেশিনারিজ ও ডিজিটাল সূচিশিল্পের দ্রুত উৎপাদনের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জিং।
দেশীয় কারুশিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন মাহীন খান। তার মতে, নকশার পাশাপাশি উৎপাদন দক্ষতা, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিপণন কৌশলের সমন্বয় অপরিহার্য। বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নারীদের বাড়িতে বসেই হস্তশিল্পের কাজ করার সুযোগ তৈরি করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং দেশীয় ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে। তাঁরা গবেষণা করে দেশীয় কারুশিল্পকে নতুনভাবে কাজে লাগান। উৎপাদন কোথায় হবে, কারা তৈরি করবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ কেমন হবে—প্রতিটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।
জামদানিসহ বিভিন্ন দেশীয় পণ্য নিয়ে বিশ্ববাজারে যে মালিকানা বা জিআই স্বত্বের দাবি নিয়ে বিতর্ক হয়, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জিআই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাজস্থান বা কাঞ্জিপুরামের মতো প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্যের শিকড় রয়েছে, যা আমাদেরও বুঝতে হবে। জামদানি কেবল একটি কাপড় নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক। তাই নিজেদের ঐতিহ্যকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।
নিজের কাজের বিষয়ে তিনি বলেন, উনিশ ও বিশ শতকের পুরোনো বাংলার নকশা নিয়ে কাজ করে সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করাই তার মূল উদ্দেশ্য।
বিশেষ করে খুলনা, ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়ার মতো অঞ্চলের কারুশিল্পের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। তবে এর মধ্যে আমাদের কিছু দেশীয় কারুশিল্প আঘাত পাচ্ছে।
মাহীন খানের মতে, ফ্যাশন ব্যক্তিগত পছন্দের হলেও নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে আপস করা ঠিক নয়।
বিশ্বায়নের যুগে মিশ্রণ স্বাভাবিক, কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমাদের রুচি, সুতি কাপড় ও আরামদায়ক পোশাকের নিজস্বতাকে ধরে রাখা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত কেবল অন্য দেশের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং নিজেদের পণ্যের মান উন্নয়ন এবং যথাযথ বিপণনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের ফ্যাশন বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রিপোর্টার নাম: 
























