বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে বিশেষ সম্প্রচারের অংশ হিসেবে চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত হচ্ছে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা ‘সুভা’। রবীন্দ্রকাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তির দুই দশক পর আবারও পর্দায় ফেরা দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করা জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা দিলারা হানিফ পূর্ণিমা দীর্ঘ সময় পর চলচ্চিত্রটি পুনর্প্রচারের অনুভূতি এবং দেশীয় চলচ্চিত্রের বর্তমান নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজের ভাবনার কথা প্রকাশ করেছেন।
‘সুভা’ চলচ্চিত্রে একজন বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী তরুণীর চরিত্রে অভিনয় করে দর্শক ও সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন পূর্ণিমা। তাঁর দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে এটি অন্যতম সেরা ও চ্যালেঞ্জিং কাজ হিসেবে স্বীকৃত। এর আগে চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় রাবেয়া খাতুনের গল্পে ‘মেঘের পরে মেঘ’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ গল্পভিত্তিক ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় ‘সুভা’ ছিল তাঁর অভিনীত তৃতীয় সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র। ছবিটিতে তৎকালীন উদীয়মান তারকা শাকিব খানও অভিনয় করেন, যা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা। পুবাইলের তীব্র গরম ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে দিনরাত পরিশ্রম করে নির্মিত এই ছবিটির স্মৃতি আজও পূর্ণিমার মানসপটে জ্বলজ্বলে।
বর্তমানে বড় পর্দায় পূর্ণিমার উপস্থিতি কিছুটা অনিয়মিত হলেও রূপালি জগতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ও পেশাদারত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। নতুন চলচ্চিত্রে কাজ করার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি জানান, মূলধারার কাজের প্রস্তাব প্রতিনিয়ত এলেও মনের মতো মানসম্পন্ন গল্প ও শক্তিশালী চরিত্রের অভাবে তিনি সম্মতি দিচ্ছেন না। পূর্ণিমার মতে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর একজন অভিনেত্রীর জন্য এমন চরিত্র বেছে নেওয়া জরুরি, যা পুরো চলচ্চিত্রে গভীর প্রভাব তৈরি করে। উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে জ্যেষ্ঠ অভিনেত্রীদের যেভাবে সময়োপযোগী ও সম্মানজনক চরিত্রে উপস্থাপন করা হয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তেমন চিত্রনাট্য নির্মাণের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। নিজেকে নতুন রূপে আবিষ্কারের অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী রোমান্টিক বা পরিপাটি ইমেজের বাইরে গিয়ে খলনায়িকা কিংবা নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করার আগ্রহের কথাও ব্যক্ত করেন এই তারকা।
দেশীয় চলচ্চিত্রের গল্প বলা এবং নির্মাণের স্বাধীনতা নিয়েও সুস্পষ্ট মতামত দিয়েছেন পূর্ণিমা। তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের দেশে যুগে যুগে সেন্সরশিপ বা নানা বিধিনিষেধের কারণে নির্মাতারা তাঁদের পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীলতা ফুটিয়ে তুলতে পারেন না। অথচ বিশ্বজুড়ে সত্য ঘটনা কিংবা বাস্তব জীবনের সংবেদনশীল নানা বিষয় নিয়ে নির্মিত ছবিগুলো বৈশ্বিক স্তরে ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছে। বাংলাদেশে চারপাশে অসংখ্য সম্ভাবনাপূর্ণ সত্য ঘটনা থাকা সত্ত্বেও সেন্সরশিপের ভয় এবং কাঠামোগত স্বাধীনতার অভাবে তেমন চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরিচালকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে এবং অভিনয়শিল্পীরাও তাঁদের অভিনয়ের বৈচিত্র্য প্রদর্শনের পর্যাপ্ত ক্ষেত্র পাচ্ছেন না।
দীর্ঘ ২১ বছর পর ‘সুভা’ চলচ্চিত্রের পুনর্প্রচার কেবল পূর্ণিমার অভিনয়জীবনের একটি স্মরণীয় মাইলফলকই মনে করিয়ে দেয় না, বরং বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যভিত্তিক কাজের গুরুত্ব এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মতে, মানসম্পন্ন গল্প ও নির্মাণ স্বাধীনতার সঠিক সমন্বয় ঘটলে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে আরও কালজয়ী কাজ তৈরি হওয়া সম্ভব।
রিপোর্টার নাম: 























