বর্তমান বিশ্বের সংগীত অঙ্গনে নারী শিল্পীদের সরব উপস্থিতি এবং দাপট অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি দৃশ্য হলেও, কয়েক দশক আগের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সময়ে রক সংগীতের মঞ্চে নারীদের প্রবেশাধিকার ছিল বলতে গেলে অসম্ভব এক ব্যাপার। পুরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্যের সেই যুগে আগমন ঘটেছিল ‘দ্য রানঅ্যাওয়েজ’ নামের এক ব্যতিক্রমী ব্যান্ডের, যা মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বিশ্বজুড়ে রক মিউজিকের ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ১৯৭৬ সালের ২ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী ‘সিবিজিবি’ ক্লাবে তাদের পরিবেশনা কেবল একটি কনসার্ট ছিল না, বরং তা ছিল একটি যুগের সূচনা। ষাটের দশকের ‘গোল্ডি অ্যান্ড দ্য জিঞ্জারব্রেডস’ কিংবা সত্তরের দশকের ‘ফ্যানি’র মতো কিছু অগ্রগামী ব্যান্ড নারীদের জন্য পথ তৈরি করলেও, দ্য রানঅ্যাওয়েজের মতো বিশাল সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক প্রভাব খুব কম দলই রাখতে পেরেছিল। পরবর্তী প্রজন্মের ‘দ্য ব্যাঙ্গলস’, ‘এল সেভেন’, ‘দ্য গো-গোজ’, ‘দ্য ডোনাস’, ‘সাহারা হটনাইটস’ এবং ‘ভিক্সেন’-এর মতো বিখ্যাত সব নারী রক ব্যান্ড এই দলটির কাছ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
১৯৭৫ সালে হলিউডের প্রখ্যাত সংগীত উদ্যোক্তা ও প্রযোজক কিম ফাওলি একটি সর্ব-নারী রক ব্যান্ড গঠনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নেন। গীতিকার কারি ক্রোমের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ঘটে উদীয়মান তরুণ গিটারিস্ট জোয়ান জেটের সঙ্গে। পরবর্তীতে হলিউডের বিখ্যাত রেইনবো বার অ্যান্ড গ্রিলের পার্কিং লটে তিনি খুঁজে পান ড্রামার স্যান্ডি ওয়েস্টকে। এরপর বিভিন্ন অডিশন ও সদস্য খোঁজার প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত রূপ নেয় দ্য রানঅ্যাওয়েজের সবচেয়ে পরিচিত ও সফল লাইনআপ—শেরি কারি, লিটা ফোর্ড, জ্যাকি ফক্স, জোয়ান জেট এবং স্যান্ডি ওয়েস্ট। অদ্ভুত এবং অগোছালোভাবে যাত্রা শুরু হলেও ব্যান্ডটির পথচলা ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকেই তারা স্বনামধন্য মারকারি রেকর্ডসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং ১৯৭৬ সালে বাজারে আসে তাদের আত্মপ্রকাশকারী প্রথম অ্যালবাম ‘দ্য রানঅ্যাওয়েজ’।
অ্যালবামটির উদ্বোধনী ট্র্যাক ‘চেরি বম্ব’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে সংগীতপ্রেমীদের মাঝে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই গানটি পরবর্তী সময়ে রক ধারার বহু নবীন শিল্পীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। অ্যালবামের অন্যান্য জনপ্রিয় গান যেমন ‘ইউ ড্রাইভ মি ওয়াইল্ড’, ‘রক অ্যান্ড রোল’, ‘ব্ল্যাকমেল’ এবং ‘ডেড এন্ড জাস্টিস’-এ চমৎকারভাবে মিশে গিয়েছিল সত্তরের দশকের গ্ল্যাম রক, হার্ড রক ও পাওয়ার পপের অনন্য উপাদান। তবে নিজ দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যান্ডটিকে প্রায়শই অবহেলার শিকার হতে হয়। আমেরিকান মূলধারার সমালোচকরা অনেক সময় তাদের কেবল কিশোরীদের একটি সাময়িক শৌখিন ব্যান্ড হিসেবে দেখত অথবা প্রচার করত যে তারা কোনো প্রকৃত সংগীতশিল্পী নয়, বরং কোনো এক প্রযোজকের সাজানো বাণিজ্যিক প্রকল্প মাত্র।
যুক্তরাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন না পেলেও মহাসমুদ্রের ওপারে জাপানে দ্য রানঅ্যাওয়েজ পেয়েছিল আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও উন্মাদনা। ১৯৭৭ সালে তাদের জাপান সফরে প্রতিটি কনসার্ট ছিল কানায় কানায় পূর্ণ, যেখানে হাজারো তরুণ ভক্ত ভিড় জমিয়েছিল। জাপানে তাদের এই উন্মাদনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, জোয়ান জেট স্বয়ং একে ‘বিটলম্যানিয়া’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এশিয়ার এই দেশটিতে তাদের সেই অভাবনীয় সাফল্য এবং কনসার্টের অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় তাদের বহুল আলোচিত লাইভ অ্যালবাম ‘লাইভ ইন জাপান’ (১৯৭৭)। জাপানি শ্রোতাদের কাছে তারা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে বিশ্বমঞ্চের বৃহত্তম রক ব্যান্ডগুলোর সঙ্গে তাদের তুলনা করা হতো।
সাফল্যের পাশাপাশি দ্য রানঅ্যাওয়েজের যাত্রাপথ কখনোই বিতোনামুক্ত বা সহজ ছিল না। প্রযোজক কিম ফাওলির কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ব্যান্ড সদস্যদের অল্প বয়স এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ নানা প্রশ্ন তাদের সবসময় সংকটে ফেলেছিল। এমনকি পরবর্তী সময়ে ব্যান্ডের একাধিক সদস্য কিম ফাওলির বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগও উত্থাপন করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে জ্যাকি ফক্স ব্যান্ড ত্যাগ করার পর এবং পরবর্তীতে শেরি কারি বিদায় নিলে জোয়ান জেট দল পরিচালনার আরও প্রধান ভূমিকা নেন। ১৯৭৮ সালে তাদের আরেকটি অ্যালবাম ‘ওয়েটিং ফর দ্য নাইট’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সদস্য পরিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৯৭৯ সালে চিরতরে ভেঙে যায় দ্য রানঅ্যাওয়েজ।
ব্যান্ডটি ভেঙে গেলেও এর সদস্যরা পরবর্তীতে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। জোয়ান জেট একক ক্যারিয়ারে হার্ড রকের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল নারী শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন। তাঁর ব্যান্ড ‘জোয়ান জেট অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাকহার্টস’-এর গাওয়া ‘আই লাভ রক অ্যান্ড রোল’ গানটি বিশ্বজুড়ে কিংবদন্তির মর্যাদা পায়। অন্যদিকে, লিটা ফোর্ড আশির দশকের অন্যতম সফল ও দক্ষ নারী মেটাল গিটারিস্ট হিসেবে রক তারকাখ্যাতি অর্জন করেন। ড্রামার স্যান্ডি ওয়েস্ট আজীবন সংগীতে সক্রিয় থেকে তরুণদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গেছেন এবং শেরি কারি পরবর্তীতে সফল অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মাত্র কয়েক বছরের সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে দ্য রানঅ্যাওয়েজ এই অকাট্য সত্য প্রমাণ করেছিল যে, রক সংগীত কেবল পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার নয়। তাদের দেখানো পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে গিটার কাঁধে মঞ্চে আলো ছড়িয়েছেন অসংখ্য নারী শিল্পী।
রিপোর্টার নাম: 
























