Hi

০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্টারডমের ঝলমলে আলোর পেছনের বিষাদ: মেরিলিন মনরোর লুকানো কবিসত্তা ও জীবনের ট্র্যাজেডি

বিংশ শতাব্দীর পপ সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক মেরিলিন মনরোকে বিশ্ব চেনে এক মোহময়ী মার্কিন নায়িকা হিসেবে। বাতাসে ওড়া স্কার্ট আর গাঢ় লাল ঠোঁটের আবেদনময়ী এই সেলিব্রিটির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রূপালি পর্দার গ্ল্যামার। কিন্তু এই দীপ্তিময় খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর মানসিক বিষাদ ও চরম নিঃসঙ্গতা। শৈশবের বঞ্চনা, পারিবারিক অস্থিরতা এবং জীবনের নানা অমসৃণ বাঁক তাঁকে বাধ্য করেছিল শব্দের কাছে সমর্পিত হতে। পর্দার আড়ালের সেই মেরিলিন মনরো ছিলেন এক নিভৃতচারী কবি, যিনি নিজের জীবনের না বলা কথা, ক্ষরণ ও যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন কবিতার পঙ্‌ক্তিতে।

শৈশবেই ভালোবাসার কাঙাল হয়ে ওঠা নরমা জিন মোর্টেনসোন থেকে তারকা মেরিলিন মনরো হয়ে ওঠার যাত্রাপথ ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। মা-বাবার বৈবাহিক স্বীকৃতি না থাকায় জন্মের পর থেকেই এতিমখানা এবং বিভিন্ন পালক পরিবারের আশ্রয়ে বড় হতে হয় তাঁকে। জীবনের প্রথমভাগে ১২ বছর বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে বারবার ব্যর্থ দাম্পত্য জীবন ও মাতৃত্বের আকুতি অপূর্ণ থাকার বেদনা তাঁর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি নোটবুক, দিনপঞ্জি এমনকি হোটেলের টিস্যু পেপারেও ছোট ছোট কবিতা ও জীবনভাবনা লিখে রাখতেন।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও মেরিলিন ছিলেন সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। ফিওদর দস্তয়েভস্কি, আলবেয়ার কাম্যু, আন্তন চেখভ থেকে শুরু করে এমিলি ডিকিনসন ও সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো মনীষীদের বই ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। তাঁর এই ব্যক্তিগত নোটবুক এবং খসড়া কবিতাগুলো ২০১০ সালে নিউইয়র্ক থেকে ‘ফ্র্যাগমেন্টস: পোয়েমস, ইনটিমেট নোটস, লেটারস বাই মেরিলিন মনরো’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। স্ট্যানলি বুচথাল ও বার্নার্ড কমেন্ট সম্পাদিত এই বইটিতে তাঁর শিরোনামহীন ১৫টি কবিতা ও বেশ কিছু চিঠি স্থান পায়, যা তাঁর জীবনের ভিন্ন এক পরিচিতি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করে।

মেরিলিনের কবিতায় রূপক বা প্রতীকের বাহুল্য ছিল না; বরং সেখানে ছিল সরল ভাষায় নিজের অস্তিত্বের সংকট ও ভালোবাসার আকুতি প্রকাশের এক নির্মম সত্য। খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দুনিয়া যাকে ‘তারকা’ বা ‘খ্যাতি’ বলে অভিহিত করে, তা আদতে এক ক্ষণস্থায়ী বিভ্রম মাত্র। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অতিরিক্ত ওষুধ ও মদ্যপান তাঁর অবসাদকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে যখন জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রহস্যজনক ও মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে চিরতরে নিভে যায় এই বিশ্বখ্যাত তারকার জীবন। রূপালি পর্দার সেই গ্ল্যামারাস নায়িকার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কবিসত্তা তাই আজও সাহিত্যপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে এক গভীর বিস্ময় ও অনুভবের জায়গা হয়ে রয়েছে।

জনপ্রিয়

রাজধানীতে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দিয়ে শুরু দিন, চার বিভাগে বৃষ্টির পূর্বাভাস

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

স্টারডমের ঝলমলে আলোর পেছনের বিষাদ: মেরিলিন মনরোর লুকানো কবিসত্তা ও জীবনের ট্র্যাজেডি

আপডেট : ০৮:২৩:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

বিংশ শতাব্দীর পপ সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক মেরিলিন মনরোকে বিশ্ব চেনে এক মোহময়ী মার্কিন নায়িকা হিসেবে। বাতাসে ওড়া স্কার্ট আর গাঢ় লাল ঠোঁটের আবেদনময়ী এই সেলিব্রিটির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রূপালি পর্দার গ্ল্যামার। কিন্তু এই দীপ্তিময় খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর মানসিক বিষাদ ও চরম নিঃসঙ্গতা। শৈশবের বঞ্চনা, পারিবারিক অস্থিরতা এবং জীবনের নানা অমসৃণ বাঁক তাঁকে বাধ্য করেছিল শব্দের কাছে সমর্পিত হতে। পর্দার আড়ালের সেই মেরিলিন মনরো ছিলেন এক নিভৃতচারী কবি, যিনি নিজের জীবনের না বলা কথা, ক্ষরণ ও যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন কবিতার পঙ্‌ক্তিতে।

শৈশবেই ভালোবাসার কাঙাল হয়ে ওঠা নরমা জিন মোর্টেনসোন থেকে তারকা মেরিলিন মনরো হয়ে ওঠার যাত্রাপথ ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। মা-বাবার বৈবাহিক স্বীকৃতি না থাকায় জন্মের পর থেকেই এতিমখানা এবং বিভিন্ন পালক পরিবারের আশ্রয়ে বড় হতে হয় তাঁকে। জীবনের প্রথমভাগে ১২ বছর বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে বারবার ব্যর্থ দাম্পত্য জীবন ও মাতৃত্বের আকুতি অপূর্ণ থাকার বেদনা তাঁর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি নোটবুক, দিনপঞ্জি এমনকি হোটেলের টিস্যু পেপারেও ছোট ছোট কবিতা ও জীবনভাবনা লিখে রাখতেন।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও মেরিলিন ছিলেন সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। ফিওদর দস্তয়েভস্কি, আলবেয়ার কাম্যু, আন্তন চেখভ থেকে শুরু করে এমিলি ডিকিনসন ও সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো মনীষীদের বই ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। তাঁর এই ব্যক্তিগত নোটবুক এবং খসড়া কবিতাগুলো ২০১০ সালে নিউইয়র্ক থেকে ‘ফ্র্যাগমেন্টস: পোয়েমস, ইনটিমেট নোটস, লেটারস বাই মেরিলিন মনরো’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। স্ট্যানলি বুচথাল ও বার্নার্ড কমেন্ট সম্পাদিত এই বইটিতে তাঁর শিরোনামহীন ১৫টি কবিতা ও বেশ কিছু চিঠি স্থান পায়, যা তাঁর জীবনের ভিন্ন এক পরিচিতি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করে।

মেরিলিনের কবিতায় রূপক বা প্রতীকের বাহুল্য ছিল না; বরং সেখানে ছিল সরল ভাষায় নিজের অস্তিত্বের সংকট ও ভালোবাসার আকুতি প্রকাশের এক নির্মম সত্য। খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দুনিয়া যাকে ‘তারকা’ বা ‘খ্যাতি’ বলে অভিহিত করে, তা আদতে এক ক্ষণস্থায়ী বিভ্রম মাত্র। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অতিরিক্ত ওষুধ ও মদ্যপান তাঁর অবসাদকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে যখন জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রহস্যজনক ও মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে চিরতরে নিভে যায় এই বিশ্বখ্যাত তারকার জীবন। রূপালি পর্দার সেই গ্ল্যামারাস নায়িকার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কবিসত্তা তাই আজও সাহিত্যপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে এক গভীর বিস্ময় ও অনুভবের জায়গা হয়ে রয়েছে।