কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সাথে সাথে এর প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন এক বিতর্ক। রে বা কাল্পনিক উপন্যাসের মতো বাস্তবেও এখন লাখ লাখ বই কিনে তা স্ক্যান করার পর পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে আরও নিখুঁত ও সমৃদ্ধ করতে এই বিতর্কিত পথ বেছে নিয়েছে। ইন্টারনেটের উন্মুক্ত তথ্যে এআই-নির্মিত কৃত্রিম এবং নিম্নমানের কনটেন্টের আধিক্য বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২৩ সালের আগের মুদ্রিত বইগুলোর চাহিদা এখন তুঙ্গে। এসব বইয়ে মানুষের চিন্তা ও ভাষার খাঁটি রূপ থাকায় তা এআই প্রশিক্ষণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রযুক্তি বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘৪০৪ মিডিয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় বড় এআই কোম্পানিগুলো সরাসরি নিজেদের পরিচয়ে বই সংগ্রহ না করে বিশেষ কিছু মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সির সাহায্য নিচ্ছে। এসব এজেন্সি গোপন রেখে বাজার থেকে পাইকারি হারে বিভিন্ন শিরোনামের বই জোগাড় করে দেয়। পরবর্তীতে অত্যন্ত আধুনিক মেশিনের সাহায্যে বইগুলোর বাঁধাই কেটে প্রতিটি পাতা আলাদা করা হয় এবং ডিজিটাল ফরম্যাটে স্ক্যান করে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা হয়। তথ্যগুলো ডেটাসেটে যুক্ত হওয়ার পর মূল কাগজের বইগুলো আর কোনো কাজে লাগে না বিধায় সেগুলোকে বিনষ্ট বা পুড়িয়ে ফেলা হয়।
বইয়ের এই অস্বাভাবিক ও যান্ত্রিক চাহিদার ফলে পুরোনো বইয়ের ব্যবসায়ের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। অনেক বিক্রেতা জানান, আগে যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত সংখ্যক বই বিক্রি হতো, বর্তমানে সেখানে পাইকারি ক্রেতাদের কারণে কয়েক শ গুণ বেশি বই বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবসায় সাময়িক আর্থিক লাভ হলেও বিক্রেতারা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। কারণ, এই নির্বিচার স্ক্যান ও ধ্বংস প্রক্রিয়ার ফলে অনেক দুর্লভ, প্রাচীন ও বিদেশি ভাষার বই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের পন্থার সূচনা ঘটেছিল প্রায় দুই বছর আগে যখন অ্যানথ্রোপিক নামক প্রতিষ্ঠানটি গুগল বুকসের সাবেক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে বিশ্বজুড়ে বই সংগ্রহের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করে।
আইনি দিক থেকে এই প্রক্রিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধ উপায়ে কেনা বই স্ক্যান করে ডিজিটাল কপিতে রূপান্তর করা এবং পরবর্তীতে তা নষ্ট করা আইনসিদ্ধ। ওপেনএআই ও মেটার বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলোতেও বিচারকেরা অনুরূপ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তবে এর ব্যতিক্রমও ঘটেছে। ‘ক্লড’ এআই চ্যাটবটের প্রশিক্ষণে পাইরেটেড বই ব্যবহারের দায়ে আদালত প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার জরিমানা ধার্য করে, যার ফলে হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত লেখককে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। এমন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম নিয়ে প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্কও নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর স্পেসএক্স দলকে বই ধ্বংস না করে বরং মলাট অক্ষত রেখে স্ক্যান করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সিঙ্গেল ভ্যালি কিংবা প্রযুক্তি দুনিয়ার সবাই এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না। ফ্যাক্টরি ইকোসিস্টেমের প্রধান নির্বাহী মাতান গ্রিনবার্গসহ বহু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মানুষের আবেগ ও মেধার প্রতীক এমন একটি বস্তুগত জিনিসকে যান্ত্রিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার পেছনে একধরণের মানবতাবিরোধী মানসিকতা কাজ করছে। এআইয়ের ক্ষুধা মেটানোর জন্য প্রাচীন ও মূল্যবান সাহিত্যিক সম্পদ চিরতরে মুছে ফেলার এই সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত মানব সভ্যতার জন্য গভীর সংকট ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
রিপোর্টার নাম: 
























