Hi

১১:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনার বড় বাজার: প্রতিদিন ২৫ কোটি টাকার বাণিজ্য

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ১১:১৫:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ০ জন দেখেছে

ভৈরব নদের তীরঘেঁষা খুলনার ঐতিহ্যের বড় বাজার এখনো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। ভোরবেলা থেকেই সেখানে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। সরু রাস্তাগুলোতে মালবাহী ভ্যান আর রিকশার জটলার পাশাপাশি কুলি ও ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। একসময় ভৈরব নদে মালবাহী নৌপরিবহনের সারি লেগে থাকলেও এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই ম্লান। রেলপথে পণ্য পরিবহনের হার কমে গিয়ে বর্তমানে অধিকাংশ পণ্য ট্রাকযোগে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। যুগের প্রয়োজনে পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও বড় বাজারের গুরুত্ব এখনো কমেনি। কুলিদের হাঁকডাক আর ক্রেতা-বিক্রেতার দর–কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। এখন সড়কপথে ট্রাকেই সিংহভাগ মালামাল পরিবহন হচ্ছে। পরিবহন আর যোগাযোগব্যবস্থার এই বাঁকবদলের দৃশ্যপটই বলে দেয়, এ অঞ্চলের বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র—ঐতিহ্যবাহী ‘বড় বাজার’।

বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে চাল ও মসলার। খুলনা ধান-চাল বণিক সমিতি ও খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. মুনীর আহমেদের ভাষ্যমতে, সামগ্রিক ব্যবসায় ভাটা পড়লেও বাজারের মোট বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকই এই দুই পণ্য দখল করে রেখেছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তথ্যানুযায়ী, একসময় বাজারের মাসিক লেনদেন এক হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করলেও বর্তমানে তা ৬৫০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার বার্ষিক হিসাব ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। রেলের বগি ভর্তি করে পণ্য আসার পুরোনো দৃশ্যও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।

বাজারে বর্তমানে চালের পাইকারি আড়ত রয়েছে ৫০ থেকে ৬০টি। কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, রংপুর ও রাজশাহীর মতো বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে চাল আসে, যা পরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট পাইকারি বাজারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে চিকন চাল ও আটাশ জাতের চালের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ওয়েস্ট মেকট রোডের চালের আড়তের পাশেই ভৈরব স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে রয়েছে কাঁচা মসলার আড়ত বা ‘কাঁচাপট্টি’। এখানে শতাধিক দোকানে হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার মতো নিত্যপণ্য পাইকারি দরে বিক্রি হয়। মৌসুমভেদে ফলের ব্যবসাও জমে ওঠে এই কাঁচাপট্টিকে ঘিরে। দিনাজপুর চাল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. ফারুক শেখ জানান, এখন চিকন চাল ও আটাশ (২৮) চালের বিক্রি সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কাঁচাপট্টি’র পাইকারি দোকানগুলোর প্রধান পণ্য হলো হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ অন্যান্য মসলা।

কেসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩ হাজার ৬৫০টি নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া দৈনিক টোলের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় আরও ৪৬০ থেকে ৪৭০টি দোকান। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার ব্যবসায়ী এবং হাজারো শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হয় এই বাজারকেন্দ্রিক। কেসিসির বাজার সুপারিনটেনডেন্ট শেখ শফিকুল হাসান দিদারের ভাষ্যমতে, দৈনিক টোল আদায়ের অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার রাজস্ব জমা হয়, আর সামগ্রিকভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বছরে ছয় কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করে সরকার।

বড় বাজারের আর্থিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট ৩৩টি ব্যাংকের শাখা কাজ করছে। ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক এস এম আশরাফুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, শুধু তাদের ব্যাংক থেকেই বাজারের ৭৭৪টি প্রতিষ্ঠান বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে বড় বাজারে এখন পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়লেও আয়তন ও অবকাঠামো সেভাবে প্রসারিত হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ বছর আগেও এই অঞ্চল থেকে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হতো, যা এখন বিকেন্দ্রীকরণের ফলে কিছুটা কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, ২০ বছর আগেও এ অঞ্চলের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্যের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই সরবরাহ হতো এই বাজার থেকে।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে সরু রাস্তার কারণে ভারী যানবাহন বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। এতে বাড়তি মজুরি দিয়ে কুলির মাধ্যমে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হয়, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মো. মুনীর আহমেদ মনে করেন, সুযোগ-সুবিধা না বাড়লে অনেক ব্যবসায়ী অন্য জায়গায় স্থানান্তর করতে বাধ্য হবেন। ভৈরব নদের গ্রাস ও জমি অধিগ্রহণের ফলে বাজারটি সংকুচিত হলেও এখনো হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

খুলনার বড় বাজার: প্রতিদিন ২৫ কোটি টাকার বাণিজ্য

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

খুলনার বড় বাজার: প্রতিদিন ২৫ কোটি টাকার বাণিজ্য

আপডেট : ১১:১৫:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

ভৈরব নদের তীরঘেঁষা খুলনার ঐতিহ্যের বড় বাজার এখনো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। ভোরবেলা থেকেই সেখানে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। সরু রাস্তাগুলোতে মালবাহী ভ্যান আর রিকশার জটলার পাশাপাশি কুলি ও ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। একসময় ভৈরব নদে মালবাহী নৌপরিবহনের সারি লেগে থাকলেও এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই ম্লান। রেলপথে পণ্য পরিবহনের হার কমে গিয়ে বর্তমানে অধিকাংশ পণ্য ট্রাকযোগে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। যুগের প্রয়োজনে পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও বড় বাজারের গুরুত্ব এখনো কমেনি। কুলিদের হাঁকডাক আর ক্রেতা-বিক্রেতার দর–কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। এখন সড়কপথে ট্রাকেই সিংহভাগ মালামাল পরিবহন হচ্ছে। পরিবহন আর যোগাযোগব্যবস্থার এই বাঁকবদলের দৃশ্যপটই বলে দেয়, এ অঞ্চলের বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র—ঐতিহ্যবাহী ‘বড় বাজার’।

বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে চাল ও মসলার। খুলনা ধান-চাল বণিক সমিতি ও খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. মুনীর আহমেদের ভাষ্যমতে, সামগ্রিক ব্যবসায় ভাটা পড়লেও বাজারের মোট বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকই এই দুই পণ্য দখল করে রেখেছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তথ্যানুযায়ী, একসময় বাজারের মাসিক লেনদেন এক হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করলেও বর্তমানে তা ৬৫০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার বার্ষিক হিসাব ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। রেলের বগি ভর্তি করে পণ্য আসার পুরোনো দৃশ্যও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।

বাজারে বর্তমানে চালের পাইকারি আড়ত রয়েছে ৫০ থেকে ৬০টি। কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, রংপুর ও রাজশাহীর মতো বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে চাল আসে, যা পরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট পাইকারি বাজারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে চিকন চাল ও আটাশ জাতের চালের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ওয়েস্ট মেকট রোডের চালের আড়তের পাশেই ভৈরব স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে রয়েছে কাঁচা মসলার আড়ত বা ‘কাঁচাপট্টি’। এখানে শতাধিক দোকানে হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার মতো নিত্যপণ্য পাইকারি দরে বিক্রি হয়। মৌসুমভেদে ফলের ব্যবসাও জমে ওঠে এই কাঁচাপট্টিকে ঘিরে। দিনাজপুর চাল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. ফারুক শেখ জানান, এখন চিকন চাল ও আটাশ (২৮) চালের বিক্রি সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কাঁচাপট্টি’র পাইকারি দোকানগুলোর প্রধান পণ্য হলো হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ অন্যান্য মসলা।

কেসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩ হাজার ৬৫০টি নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া দৈনিক টোলের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় আরও ৪৬০ থেকে ৪৭০টি দোকান। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার ব্যবসায়ী এবং হাজারো শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ হয় এই বাজারকেন্দ্রিক। কেসিসির বাজার সুপারিনটেনডেন্ট শেখ শফিকুল হাসান দিদারের ভাষ্যমতে, দৈনিক টোল আদায়ের অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার রাজস্ব জমা হয়, আর সামগ্রিকভাবে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বছরে ছয় কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করে সরকার।

বড় বাজারের আর্থিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট ৩৩টি ব্যাংকের শাখা কাজ করছে। ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক এস এম আশরাফুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, শুধু তাদের ব্যাংক থেকেই বাজারের ৭৭৪টি প্রতিষ্ঠান বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে বড় বাজারে এখন পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়লেও আয়তন ও অবকাঠামো সেভাবে প্রসারিত হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ বছর আগেও এই অঞ্চল থেকে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হতো, যা এখন বিকেন্দ্রীকরণের ফলে কিছুটা কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, ২০ বছর আগেও এ অঞ্চলের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্যের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই সরবরাহ হতো এই বাজার থেকে।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে সরু রাস্তার কারণে ভারী যানবাহন বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। এতে বাড়তি মজুরি দিয়ে কুলির মাধ্যমে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হয়, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মো. মুনীর আহমেদ মনে করেন, সুযোগ-সুবিধা না বাড়লে অনেক ব্যবসায়ী অন্য জায়গায় স্থানান্তর করতে বাধ্য হবেন। ভৈরব নদের গ্রাস ও জমি অধিগ্রহণের ফলে বাজারটি সংকুচিত হলেও এখনো হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।