Hi

০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তীব্র তাপপ্রবাহ ও তীব্র কর্মিসংকট মোকাবিলায় জাপানের নির্মাণশিল্পের অভিনব কৌশল

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র হচ্ছে তাপপ্রবাহ, আর সেই সঙ্গে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ঘনীভূত হচ্ছে তীব্র কর্মিসংকট। এই দুই বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে জাপানের নির্মাণশিল্প এক যুগান্তকারী ও অনুকরণীয় মডেল গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে দেশটির গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা যখন প্রায়ই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছায় এবং আর্দ্রতা চরম আকার ধারণ করে, তখন নির্মাণশ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কর্মপরিবেশ রক্ষা করা একটি প্রধান জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সাংবাদিক সফরে জাপানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আবাসন ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠান দাইওয়া হাউস গ্রুপ তাদের টোকিও ও ইয়োকোহামার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে গৃহীত বহুমুখী নিরাপত্তা কৌশল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার নানা দিক তুলে ধরেছে।

জাপানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে হিটস্ট্রোকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও হতাহতের হার সম্প্রতি রেকর্ড ছুঁয়েছে, যার একটি বড় অংশ ঘটে থাকে নির্মাণ খাতে। এই বাস্তবতায় জাপান সরকার কঠোর শিল্পনিরাপত্তা অধ্যাদেশ ও বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালু করেছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাইওয়া হাউস গ্রুপ ইয়োকোহামায় নির্মাণাধীন ‘মিনাতো মিরাই–২১ সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট ৫২’ প্রকল্পের মতো মেগা সাইটগুলোতে নজিরবিহীন সব সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে। প্রকল্পটিতে ফ্যানযুক্ত বিশেষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক, বরফ মিশ্রিত ইলেকট্রোলাইট পানীয় বা ‘আইস স্লারি’, এবং অস্থায়ী শীতলীকরণ কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ডব্লিউবিজিটি (ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার) সূচক পর্যবেক্ষণ করে কর্মীরা নিয়মিত বিরতি নিচ্ছেন, যা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে দিয়েছে।

শুধু প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা নয়, জাপানের নির্মাণ খাতে তীব্র জনবল ঘাটতি মেটাতে বহুমাত্রিক কৌশল নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর দক্ষ বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা যেন নিরাপত্তায় কোনো বাধা সৃষ্টি না করে, সেজন্য কিউআর কোড স্ক্যান করে মাতৃভাষায় নিরাপত্তা ভিডিও দেখার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘ফেইসমা’, ডিজিটাল ফিল্ড নোটবুক ‘ই-ইয়াচো’ এবং বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিম) প্রযুক্তির মতো উদ্ভাবনী ডিজিটাল টুলগুলো প্রবর্তনের মাধ্যমে কাজের গতি ও নিখুঁত সমন্বয় নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা কাগজবিহীন ও শ্রমসাশ্রয়ী পরিবেশ তৈরি করেছে।

জাপানি নির্মাণ খাতের এই বহুমুখী ব্যবস্থাপনা শুধু অভ্যন্তরীণ সংকট উত্তরণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি আধুনিক কর্মপরিবেশের টেকসই মডেল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নির্মাণশিল্পের জন্য জাপানি এই প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা কৌশল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয় হতে পারে। একই সঙ্গে যারা ভবিষ্যতে জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এই উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

জনপ্রিয়

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত এড়াতে ট্রাম্পকে তেল আবিব বা তেহরানে বড় হামলা থেকে বিরত থাকার তাগিদ এমবিএসের

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

তীব্র তাপপ্রবাহ ও তীব্র কর্মিসংকট মোকাবিলায় জাপানের নির্মাণশিল্পের অভিনব কৌশল

আপডেট : ০৫:২২:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র হচ্ছে তাপপ্রবাহ, আর সেই সঙ্গে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ঘনীভূত হচ্ছে তীব্র কর্মিসংকট। এই দুই বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে জাপানের নির্মাণশিল্প এক যুগান্তকারী ও অনুকরণীয় মডেল গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে দেশটির গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা যখন প্রায়ই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছায় এবং আর্দ্রতা চরম আকার ধারণ করে, তখন নির্মাণশ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কর্মপরিবেশ রক্ষা করা একটি প্রধান জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সাংবাদিক সফরে জাপানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আবাসন ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠান দাইওয়া হাউস গ্রুপ তাদের টোকিও ও ইয়োকোহামার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে গৃহীত বহুমুখী নিরাপত্তা কৌশল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার নানা দিক তুলে ধরেছে।

জাপানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে হিটস্ট্রোকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও হতাহতের হার সম্প্রতি রেকর্ড ছুঁয়েছে, যার একটি বড় অংশ ঘটে থাকে নির্মাণ খাতে। এই বাস্তবতায় জাপান সরকার কঠোর শিল্পনিরাপত্তা অধ্যাদেশ ও বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালু করেছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাইওয়া হাউস গ্রুপ ইয়োকোহামায় নির্মাণাধীন ‘মিনাতো মিরাই–২১ সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট ৫২’ প্রকল্পের মতো মেগা সাইটগুলোতে নজিরবিহীন সব সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে। প্রকল্পটিতে ফ্যানযুক্ত বিশেষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক, বরফ মিশ্রিত ইলেকট্রোলাইট পানীয় বা ‘আইস স্লারি’, এবং অস্থায়ী শীতলীকরণ কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ডব্লিউবিজিটি (ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার) সূচক পর্যবেক্ষণ করে কর্মীরা নিয়মিত বিরতি নিচ্ছেন, যা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে দিয়েছে।

শুধু প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা নয়, জাপানের নির্মাণ খাতে তীব্র জনবল ঘাটতি মেটাতে বহুমাত্রিক কৌশল নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর দক্ষ বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা যেন নিরাপত্তায় কোনো বাধা সৃষ্টি না করে, সেজন্য কিউআর কোড স্ক্যান করে মাতৃভাষায় নিরাপত্তা ভিডিও দেখার সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘ফেইসমা’, ডিজিটাল ফিল্ড নোটবুক ‘ই-ইয়াচো’ এবং বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিম) প্রযুক্তির মতো উদ্ভাবনী ডিজিটাল টুলগুলো প্রবর্তনের মাধ্যমে কাজের গতি ও নিখুঁত সমন্বয় নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা কাগজবিহীন ও শ্রমসাশ্রয়ী পরিবেশ তৈরি করেছে।

জাপানি নির্মাণ খাতের এই বহুমুখী ব্যবস্থাপনা শুধু অভ্যন্তরীণ সংকট উত্তরণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি আধুনিক কর্মপরিবেশের টেকসই মডেল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নির্মাণশিল্পের জন্য জাপানি এই প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা কৌশল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয় হতে পারে। একই সঙ্গে যারা ভবিষ্যতে জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এই উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।