Hi

০৫:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক রূপান্তর ও প্রত্যাশার বাস্তবতা: জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের অর্জন ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চেপে বসা একদলীয় ও স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর সাধারণ মানুষের মনে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের বিপুল আশা তৈরি হয়েছিল। তবে রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা কত দ্রুত পূরণ হতে পারে এবং বাস্তবে কতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে সমাজজুড়ে এখন নানা বিশ্লেষণ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথম আলোর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়ার এক বিশ্লেষণে বিষয়টি রাজনৈতিক তত্ত্ব ও বৈশ্বিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের মধ্যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের যে সুবিশাল আকাক্সক্ষা তৈরি হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে ‘রেভোল্যুশন অব রাইজিং এক্সপেক্টেশন’ বা ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশার বিপ্লব বলা হয়ে থাকে। তবে দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের সীমিত সক্ষমতার কারণে এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা দ্রুত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে সাময়িকভাবে সমাজে কিছুটা হতাশা ছড়াতে দেখা যায়। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস দ্য তকভিলের তত্ত্ব অনুযায়ী, পুরোনো স্বৈরাচারী শাসনকে উৎখাত করা গেলেও রাতারাতি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। একইভাবে বিখ্যাত দার্শনিক হানা আরেন্ট উল্লেখ করেছেন যে, গণ-অভ্যুত্থান স্বাধীনতার নতুন পথ খুলে দিলেও টেকসই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা।

বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় ধরনের যেকোনো রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব তৎকালীন সময়ে চরম সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিলেও শেষ পর্যন্ত তা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। একইভাবে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের পতন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ‘আরব বসন্ত’-এর পর অনেক দেশকে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্ক লিঞ্চ ও টমাস ক্যারোথার্সের মতে, স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ‘ধূসর অঞ্চল’ বা অস্থির সময় তৈরি হয়, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে কিন্তু রাজনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ফলে বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত সুফল পেতে কয়েক বছর এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গত দুই বছরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বেশ কিছু ঐতিহাসিক অর্জন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অবসান, জনগণের হারানো ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গুম-খুন ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতির ছেদ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় রাজনৈতিক পরিসরে নতুন সচেতনতা তৈরি হওয়া এই আন্দোলনের অন্যতম বড় সাফল্য। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং উগ্র ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা জনমনে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল। তা সত্ত্বেও একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেও জন-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক সংস্কার এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন বজায় রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত সরকারের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার দায় সরাসরি গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তির ওপর চাপানো সমীচীন নয়। সরকার একটি সাময়িক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ও নীতিগত মুহূর্ত। ফলে দ্রুত ফল পাওয়ার অধৈর্যতায় পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা টেকসই রাষ্ট্র গঠনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

জনপ্রিয়

ইতিহাস রচনায় মুসলিম মনীষীদের বৈপ্লবিক অবদান ও আধুনিক ইতিহাসতত্ত্বের ভিত্তি

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক রূপান্তর ও প্রত্যাশার বাস্তবতা: জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পর প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন

আপডেট : ০৪:২৬:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের অর্জন ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চেপে বসা একদলীয় ও স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর সাধারণ মানুষের মনে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের বিপুল আশা তৈরি হয়েছিল। তবে রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা কত দ্রুত পূরণ হতে পারে এবং বাস্তবে কতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে সমাজজুড়ে এখন নানা বিশ্লেষণ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথম আলোর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়ার এক বিশ্লেষণে বিষয়টি রাজনৈতিক তত্ত্ব ও বৈশ্বিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের মধ্যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের যে সুবিশাল আকাক্সক্ষা তৈরি হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে ‘রেভোল্যুশন অব রাইজিং এক্সপেক্টেশন’ বা ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশার বিপ্লব বলা হয়ে থাকে। তবে দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের সীমিত সক্ষমতার কারণে এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা দ্রুত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে সাময়িকভাবে সমাজে কিছুটা হতাশা ছড়াতে দেখা যায়। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস দ্য তকভিলের তত্ত্ব অনুযায়ী, পুরোনো স্বৈরাচারী শাসনকে উৎখাত করা গেলেও রাতারাতি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। একইভাবে বিখ্যাত দার্শনিক হানা আরেন্ট উল্লেখ করেছেন যে, গণ-অভ্যুত্থান স্বাধীনতার নতুন পথ খুলে দিলেও টেকসই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা।

বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় ধরনের যেকোনো রাজনৈতিক রূপান্তরের পথ অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব তৎকালীন সময়ে চরম সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিলেও শেষ পর্যন্ত তা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। একইভাবে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের পতন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ‘আরব বসন্ত’-এর পর অনেক দেশকে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্ক লিঞ্চ ও টমাস ক্যারোথার্সের মতে, স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ‘ধূসর অঞ্চল’ বা অস্থির সময় তৈরি হয়, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে কিন্তু রাজনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ফলে বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত সুফল পেতে কয়েক বছর এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গত দুই বছরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বেশ কিছু ঐতিহাসিক অর্জন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অবসান, জনগণের হারানো ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গুম-খুন ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতির ছেদ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় রাজনৈতিক পরিসরে নতুন সচেতনতা তৈরি হওয়া এই আন্দোলনের অন্যতম বড় সাফল্য। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং উগ্র ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা জনমনে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল। তা সত্ত্বেও একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেও জন-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক সংস্কার এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন বজায় রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত সরকারের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার দায় সরাসরি গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তির ওপর চাপানো সমীচীন নয়। সরকার একটি সাময়িক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ও নীতিগত মুহূর্ত। ফলে দ্রুত ফল পাওয়ার অধৈর্যতায় পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা টেকসই রাষ্ট্র গঠনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।