Hi

০৬:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেত্রকোনায় মহাদেও নদে অবৈধ বালু উত্তোলনে শ্রমিকের মৃত্যু: জনজীবন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় মহাদেও নদে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রিফাত (২০) নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে রংছাতি ইউনিয়নের বড়ুয়াকোনা এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। অবৈধ বালু সিন্ডিকেটের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ হারানো এই যুবক সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার গন্দিরগাঁও গ্রামের সেকুল মিয়ার ছেলে। তার মৃত্যু আবারও অবৈধ বালু উত্তোলনের ভয়াবহ পরিণতি এবং স্থানীয় জনজীবনে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাবের দিকে আঙুল তুলেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত রিফাত বালু উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত দুটি নৌকার মাঝখানে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক শৌভিক শ্রাবণ দত্ত জানিয়েছেন, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রিফাতের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাটি নদের বুক থেকে অবৈধভাবে বালু আহরণের ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে এনেছে। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করা হয়, যার ফলস্বরূপ প্রায়শই এমন দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মহাদেও নদে নির্বিচারে বালু উত্তোলন চলছে। তাদের দাবি, প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত দুই শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকায় এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। উত্তোলনকৃত বালু নদের তীরে বিভিন্ন স্থানে মজুত করে ট্রলি ও ড্রামট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়, যা এই অবৈধ ব্যবসার ব্যাপকতা প্রমাণ করে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ২২০টিরও বেশি ছোট-বড় নৌকায় বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে আশপাশের এলাকায় নদীভাঙন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বসতবাড়ি, কৃষিজমি, বাজার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখন ভাঙনের মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছরে বহু পরিবার তাদের পৈতৃক জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের এই কর্মকাণ্ড কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্যও এক ভয়াবহ হুমকি। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হচ্ছে, নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততার পরিবর্তন ঘটছে, যা জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। নদীর তীরবর্তী কৃষিজমিগুলোর উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং অনেক স্থানে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানীয় জলের সংকটও দেখা দিচ্ছে। এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে কৃষি নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য। এছাড়াও, বালি পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী ট্রলি ও ট্রাক স্থানীয় রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে, যা রক্ষণাবেক্ষণে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

রংছাতি ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা আলী আজগর স্বীকার করেছেন যে, বালু উত্তোলন ঠেকাতে নদের বিভিন্ন পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলেও, তা বারবার ভেঙে ফেলা হয়েছে। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমানে মহাদেও নদে কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এন এম আবদুল্লাহ আল মামুন অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি পরিচালিত অভিযানে বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং একাধিক নৌকা জব্দ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের তৎপরতা সত্ত্বেও কীভাবে দিনের পর দিন এত বিশাল পরিসরে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে? স্থানীয়রা বলছেন, একটি শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এর পেছনে জড়িত, যারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা ক্ষেত্রবিশেষে যোগসাজশে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রিফাতের এই অকাল মৃত্যু আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে, কেবল অভিযান বা জরিমানা নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল উৎস বন্ধ করতে এবং এর সাথে জড়িত প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে আরও সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি, বালু শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করাও জরুরি।

জনপ্রিয়

সেন্ট বার্থসে হাইডি ক্লুম ও টম কাউলিটজের ৭ম বিবাহবার্ষিকী, সৈকতের ভাইরাল ছবি ঘিরে জোর চর্চা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

নেত্রকোনায় মহাদেও নদে অবৈধ বালু উত্তোলনে শ্রমিকের মৃত্যু: জনজীবন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

আপডেট : ০৩:২৪:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় মহাদেও নদে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রিফাত (২০) নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে রংছাতি ইউনিয়নের বড়ুয়াকোনা এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। অবৈধ বালু সিন্ডিকেটের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ হারানো এই যুবক সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার গন্দিরগাঁও গ্রামের সেকুল মিয়ার ছেলে। তার মৃত্যু আবারও অবৈধ বালু উত্তোলনের ভয়াবহ পরিণতি এবং স্থানীয় জনজীবনে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাবের দিকে আঙুল তুলেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত রিফাত বালু উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত দুটি নৌকার মাঝখানে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন। সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক শৌভিক শ্রাবণ দত্ত জানিয়েছেন, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রিফাতের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাটি নদের বুক থেকে অবৈধভাবে বালু আহরণের ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে এনেছে। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত করা হয়, যার ফলস্বরূপ প্রায়শই এমন দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মহাদেও নদে নির্বিচারে বালু উত্তোলন চলছে। তাদের দাবি, প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত দুই শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকায় এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। উত্তোলনকৃত বালু নদের তীরে বিভিন্ন স্থানে মজুত করে ট্রলি ও ড্রামট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়, যা এই অবৈধ ব্যবসার ব্যাপকতা প্রমাণ করে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ২২০টিরও বেশি ছোট-বড় নৌকায় বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে আশপাশের এলাকায় নদীভাঙন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বসতবাড়ি, কৃষিজমি, বাজার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখন ভাঙনের মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছরে বহু পরিবার তাদের পৈতৃক জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের এই কর্মকাণ্ড কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্যও এক ভয়াবহ হুমকি। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হচ্ছে, নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততার পরিবর্তন ঘটছে, যা জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। নদীর তীরবর্তী কৃষিজমিগুলোর উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং অনেক স্থানে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানীয় জলের সংকটও দেখা দিচ্ছে। এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে কৃষি নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য। এছাড়াও, বালি পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী ট্রলি ও ট্রাক স্থানীয় রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে, যা রক্ষণাবেক্ষণে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

রংছাতি ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা আলী আজগর স্বীকার করেছেন যে, বালু উত্তোলন ঠেকাতে নদের বিভিন্ন পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলেও, তা বারবার ভেঙে ফেলা হয়েছে। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমানে মহাদেও নদে কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এন এম আবদুল্লাহ আল মামুন অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি পরিচালিত অভিযানে বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং একাধিক নৌকা জব্দ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের তৎপরতা সত্ত্বেও কীভাবে দিনের পর দিন এত বিশাল পরিসরে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে? স্থানীয়রা বলছেন, একটি শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এর পেছনে জড়িত, যারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা ক্ষেত্রবিশেষে যোগসাজশে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রিফাতের এই অকাল মৃত্যু আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে, কেবল অভিযান বা জরিমানা নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল উৎস বন্ধ করতে এবং এর সাথে জড়িত প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে আরও সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি, বালু শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করাও জরুরি।