Hi

০৬:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগামীকাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী: বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর এক কিংবদন্তি

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ০৬:২২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ জন দেখেছে

আগামীকাল শনিবার, ৭ই আগস্ট, ২২শে শ্রাবণ, বাঙালি জাতির মনন ও সাংস্কৃতিক চেতনার মূর্ত প্রতীক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী। প্রতি বছর এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতি স্মরণ করে তাঁর অমূল্য অবদান, যা বাংলা সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর প্রয়াণদিবসে বিভিন্ন আয়োজন ও স্মারক অনুষ্ঠানে তাঁর কর্ম ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়।

১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ) ৮১ বছর বয়সে কলকাতার জোড়াসাঁকোর পৈতৃক বাসভবনে এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮৬১ সালের ৭ই মে (১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) একই ঠাকুরবাড়িতে, বিখ্যাত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা সুন্দরী দেবীর ১৫ সন্তানের মধ্যে চতুর্দশ হিসেবে। এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর শৈশব কেটেছিল, যা তাঁর স্বাধীনচেতা মন ও ব্যাপক সৃজনশীলতার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। পদ্মাপাড়ে নৌকায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, যেখানে তিনি বাংলার প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন।

মাত্র আট বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে এক অনবদ্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর সৃষ্টিসম্ভার বাংলা কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র এবং শিশুসাহিত্যসহ প্রায় প্রতিটি শাখাকে স্বর্ণোজ্জ্বল করেছে। বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তু ও বিপুল পরিমাণ রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেন। গীতিকার ও সুরস্রষ্টা হিসেবে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই; দুই হাজারের অধিক গান রচনা ও সেগুলোর সুরারোপ করে তিনি বাংলা সংগীতে এক অমর অধ্যায় সৃষ্টি করেন। এছাড়াও তাঁর চিত্রকর্ম বাংলা শিল্পকলায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল তাঁর অনন্য শিক্ষাদর্শনের প্রতিফলন, যেখানে প্রকৃতি ও সৃজনশীলতার সান্নিধ্যে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ ঘটত। গ্রামীণ জনজীবনের উন্নয়নে তিনি সমবায়ভিত্তিক কৃষিঋণ প্রবর্তন করেন, যা কৃষক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সহায়ক হয়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল দৃঢ় ও সোচ্চার; ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত ‘নাইটহুড’ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন, যা তাঁর মানবতাবোধ ও দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

১৯১৩ সালে তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করে। এই পুরস্কার শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, বরং সমগ্র বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্যও ছিল এক বিশাল স্বীকৃতি। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি শুধু জাতীয় সংগীত হিসেবেই গৃহীত হয়নি, এটি অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে অদম্য সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল, যা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরই বাংলাদেশ ও ভারতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রবীন্দ্রসংগীত, আবৃত্তি, নৃত্যনাট্য, আলোচনা সভা এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম পাঠের মধ্য দিয়ে এই মহান কবিকে স্মরণ করা হয়। বিগত বছরগুলোতে ঢাকার ছায়ানট মিলনায়তনে তাঁর গীতিনাট্য ‘শ্যামা’সহ বিভিন্ন পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সৃষ্টি, দর্শন, মানবতাবাদী চেতনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অমর ও শ্রদ্ধাভাজন হয়ে থাকবেন।

জনপ্রিয়

আগামীকাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী: বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর এক কিংবদন্তি

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

আগামীকাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী: বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর এক কিংবদন্তি

আপডেট : ০৬:২২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

আগামীকাল শনিবার, ৭ই আগস্ট, ২২শে শ্রাবণ, বাঙালি জাতির মনন ও সাংস্কৃতিক চেতনার মূর্ত প্রতীক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী। প্রতি বছর এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতি স্মরণ করে তাঁর অমূল্য অবদান, যা বাংলা সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর প্রয়াণদিবসে বিভিন্ন আয়োজন ও স্মারক অনুষ্ঠানে তাঁর কর্ম ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়।

১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ) ৮১ বছর বয়সে কলকাতার জোড়াসাঁকোর পৈতৃক বাসভবনে এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮৬১ সালের ৭ই মে (১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ) একই ঠাকুরবাড়িতে, বিখ্যাত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা সুন্দরী দেবীর ১৫ সন্তানের মধ্যে চতুর্দশ হিসেবে। এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর শৈশব কেটেছিল, যা তাঁর স্বাধীনচেতা মন ও ব্যাপক সৃজনশীলতার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। পদ্মাপাড়ে নৌকায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, যেখানে তিনি বাংলার প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন।

মাত্র আট বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে এক অনবদ্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর সৃষ্টিসম্ভার বাংলা কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র এবং শিশুসাহিত্যসহ প্রায় প্রতিটি শাখাকে স্বর্ণোজ্জ্বল করেছে। বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তু ও বিপুল পরিমাণ রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেন। গীতিকার ও সুরস্রষ্টা হিসেবে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই; দুই হাজারের অধিক গান রচনা ও সেগুলোর সুরারোপ করে তিনি বাংলা সংগীতে এক অমর অধ্যায় সৃষ্টি করেন। এছাড়াও তাঁর চিত্রকর্ম বাংলা শিল্পকলায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল তাঁর অনন্য শিক্ষাদর্শনের প্রতিফলন, যেখানে প্রকৃতি ও সৃজনশীলতার সান্নিধ্যে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ ঘটত। গ্রামীণ জনজীবনের উন্নয়নে তিনি সমবায়ভিত্তিক কৃষিঋণ প্রবর্তন করেন, যা কৃষক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সহায়ক হয়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল দৃঢ় ও সোচ্চার; ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত ‘নাইটহুড’ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন, যা তাঁর মানবতাবোধ ও দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

১৯১৩ সালে তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করে। এই পুরস্কার শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, বরং সমগ্র বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্যও ছিল এক বিশাল স্বীকৃতি। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি শুধু জাতীয় সংগীত হিসেবেই গৃহীত হয়নি, এটি অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে অদম্য সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল, যা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরই বাংলাদেশ ও ভারতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রবীন্দ্রসংগীত, আবৃত্তি, নৃত্যনাট্য, আলোচনা সভা এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম পাঠের মধ্য দিয়ে এই মহান কবিকে স্মরণ করা হয়। বিগত বছরগুলোতে ঢাকার ছায়ানট মিলনায়তনে তাঁর গীতিনাট্য ‘শ্যামা’সহ বিভিন্ন পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সৃষ্টি, দর্শন, মানবতাবাদী চেতনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অমর ও শ্রদ্ধাভাজন হয়ে থাকবেন।