Hi

০১:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বিরোধপূর্ণ জমি দখল নিয়ে সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতা ও আইনি মারপ্যাঁচ

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে প্রায় দেড় শ একর বনভূমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে। আদালতের সুনির্দিষ্ট স্থিতাবস্থার আদেশ অমান্য করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় এই বিরোধপূর্ণ জমির দখল বুঝে পেয়েছে স্থানীয় ইছলাছড়া পুঞ্জির খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের লোকজন। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে কীভাবে এ ধরনের সমঝোতা হলো, তা খতিয়ে দেখে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯২৪ সালে ঘোষিত বরমচাল ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্টকে কেন্দ্র করে। ১ হাজার ১৯৭ দশমিক ৬০ একর আয়তনের এই সংরক্ষিত বনের ভেতরেই অবস্থিত ইছলাছড়া পুঞ্জি, যেখানে ৬০ থেকে ৭০টি খাসিয়া ও গারো পরিবার পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। তবে বনের প্রায় ১৫০ একর জমির মালিকানা দাবি করে আসছে বন বিভাগ। অন্যদিকে, এই জমির ওপর দীর্ঘ সময় ধরে অধিকার দাবি করে আসছিল পুঞ্জির বাসিন্দারা। গত এক দশকে স্থানীয় ১৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই সংরক্ষিত বনভূমির কিছু অংশ দখল করে সেখানে বাণিজ্যিক গাছের বাগান গড়ে তোলেন।

পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে ২০২২ সালে, যখন দখলকারীরা ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী টিপু চৌধুরীর কাছে বাগানের সমস্ত গাছ বিক্রি করে দেন। ওই সময় টিপু চৌধুরী প্রায় ৫০০ গাছ কেটে ফেললে বন বিভাগ নড়েচড়ে বসে এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে। একই সময়ে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব আদালতে গড়ায়। খাসিয়া সম্প্রদায়ের করা একটি রিট বা মামলার প্রেক্ষিতে আদালত ওই জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন, যার অর্থ হলো—জমির বর্তমান অবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না এবং উভয়পক্ষকেই শান্ত থাকতে হবে।

তবে আদালতের এই নির্দেশকে পাশ কাটিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলামের মধ্যস্থতায় একটি রফা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুঞ্জির লোকজন জমি উদ্ধারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের শরণাপন্ন হলে তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যস্থতায় পুঞ্জির লোকজন এবং বাগানমালিকদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, বাগানমালিকরা জমি ছেড়ে দেবেন এবং এর ক্ষতিপূরণ বাবদ পুঞ্জির পক্ষ থেকে ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হবে। টাকা হস্তান্তরের পর দখলকারীরা জমি থেকে সরে দাঁড়ায় এবং পুঞ্জির লোকজন সেখানে পুনরায় সুপারিগাছের চারা রোপণ করেন।

এ বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে। সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আদালতে স্থিতাবস্থার মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এ ধরনের সমঝোতা বা জবরদস্তিমূলক দখল সম্পূর্ণ বেআইনি। বন বিভাগ ইতোমধ্যে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে। অন্যদিকে, কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সজাগ রয়েছে এবং উভয়পক্ষকেই আদালতের আদেশ মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা এবং জনপ্রতিনিধির মধ্যস্থতার এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

জনপ্রিয়

সন্দ্বীপে ১৩ লাখ টাকার সেচ প্রকল্প অচল: কৃষকদের হাহাকার

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বিরোধপূর্ণ জমি দখল নিয়ে সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতা ও আইনি মারপ্যাঁচ

আপডেট : ১২:২২:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে প্রায় দেড় শ একর বনভূমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে। আদালতের সুনির্দিষ্ট স্থিতাবস্থার আদেশ অমান্য করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় এই বিরোধপূর্ণ জমির দখল বুঝে পেয়েছে স্থানীয় ইছলাছড়া পুঞ্জির খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের লোকজন। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে কীভাবে এ ধরনের সমঝোতা হলো, তা খতিয়ে দেখে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯২৪ সালে ঘোষিত বরমচাল ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্টকে কেন্দ্র করে। ১ হাজার ১৯৭ দশমিক ৬০ একর আয়তনের এই সংরক্ষিত বনের ভেতরেই অবস্থিত ইছলাছড়া পুঞ্জি, যেখানে ৬০ থেকে ৭০টি খাসিয়া ও গারো পরিবার পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। তবে বনের প্রায় ১৫০ একর জমির মালিকানা দাবি করে আসছে বন বিভাগ। অন্যদিকে, এই জমির ওপর দীর্ঘ সময় ধরে অধিকার দাবি করে আসছিল পুঞ্জির বাসিন্দারা। গত এক দশকে স্থানীয় ১৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই সংরক্ষিত বনভূমির কিছু অংশ দখল করে সেখানে বাণিজ্যিক গাছের বাগান গড়ে তোলেন।

পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে ২০২২ সালে, যখন দখলকারীরা ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী টিপু চৌধুরীর কাছে বাগানের সমস্ত গাছ বিক্রি করে দেন। ওই সময় টিপু চৌধুরী প্রায় ৫০০ গাছ কেটে ফেললে বন বিভাগ নড়েচড়ে বসে এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে। একই সময়ে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব আদালতে গড়ায়। খাসিয়া সম্প্রদায়ের করা একটি রিট বা মামলার প্রেক্ষিতে আদালত ওই জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন, যার অর্থ হলো—জমির বর্তমান অবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না এবং উভয়পক্ষকেই শান্ত থাকতে হবে।

তবে আদালতের এই নির্দেশকে পাশ কাটিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলামের মধ্যস্থতায় একটি রফা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুঞ্জির লোকজন জমি উদ্ধারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের শরণাপন্ন হলে তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যস্থতায় পুঞ্জির লোকজন এবং বাগানমালিকদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, বাগানমালিকরা জমি ছেড়ে দেবেন এবং এর ক্ষতিপূরণ বাবদ পুঞ্জির পক্ষ থেকে ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হবে। টাকা হস্তান্তরের পর দখলকারীরা জমি থেকে সরে দাঁড়ায় এবং পুঞ্জির লোকজন সেখানে পুনরায় সুপারিগাছের চারা রোপণ করেন।

এ বিষয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে। সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আদালতে স্থিতাবস্থার মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এ ধরনের সমঝোতা বা জবরদস্তিমূলক দখল সম্পূর্ণ বেআইনি। বন বিভাগ ইতোমধ্যে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে। অন্যদিকে, কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সজাগ রয়েছে এবং উভয়পক্ষকেই আদালতের আদেশ মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা এবং জনপ্রতিনিধির মধ্যস্থতার এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।