ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপায়ত্যকায় চলমান সংঘাত নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বহুল আলোচিত শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গাজার শাসকগোষ্ঠী ও সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার শর্ত নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অনড় অবস্থানের কারণে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ বড় ধরণের হোঁচট খেয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধবিরতির আশার আলো দেখা গেলেও তেলআবিবের নতুন শর্ত এই প্রচেষ্টাকে আবারও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, গাজা সংকট সমাধানে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে এবং ইসরায়েল এই পরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং এর বিনিময়ে ইসরায়েলি বাহিনী ধাপে ধাপে গাজা উপত্যকা থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। তবে এই ঘোষণার পরপরই দুই পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থানে জটিলতা বাড়ে। ইসরায়েলি পক্ষ পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, হামাস সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র ত্যাগ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না তাদের সামরিক বাহিনী। বিপরীতে হামাস জানিয়েছে, ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ এবং পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার ছাড়া তারা কোনোভাবেই অস্ত্র সংবরণ করবে না।
গত মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খোলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি জানান, ওয়াশিংটন প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর শর্তগুলো ইসরায়েল মেনে নেয়নি। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ট্রাম্প প্রশাসন বা তাদের সহযোগীরা হয়তো হামাসকে নিরস্ত্র করার স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন প্রশাসনের পাঠানো খসড়া প্রস্তাবটি ইসরায়েলি সরকার পর্যালোচনা করে তাদের আপত্তির কথা জানিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। এর আগে সোমবার ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রধান দূত নিকোলাই স্লাদেনভ তেলআবিবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করলেও তাতে কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয়নি।
প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর গাজার নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ নামক সীমারেখায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। এর ফলে গাজার ৪৭ শতাংশ এলাকা ফিলিস্তিনিদের এবং ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের পরিবর্তে ইসরায়েল গাজায় তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হামাস পুরোপুরি ধ্বংস বা নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেনারা তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে এক পাও নড়বে না।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত থাকায় নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই চুক্তি নাকচ না করে আলোচনার নাটক চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলত ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গীদের প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু। আসছে অক্টোবরের নির্ধারিত ইসরায়েলি নির্বাচনে এই উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন তার রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। ফলে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার বা কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার মতো রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে রাজি নন তিনি। পরিণতিতে, ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ এখন অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
রিপোর্টার নাম: 























