রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর ডেমোক্রেসি’ নামের এই বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন সব বয়সের মানুষ। বৈরী আবহাওয়া ও মুষলধারে বৃষ্টি কোনোভাবেই দমাতে পারেনি উপস্থিত সাধারণ দর্শকদের উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো উদ্যান চত্বর এক উৎসবমুখর জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
গতকাল বুধবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) যৌথ উদ্যোগে এই জমজমাট কনসার্টের আয়োজন করা হয়। এবারের এই আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘গণতন্ত্রের শক্তিতে গড়ি সাম্য, সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির বাংলাদেশ’। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর কনসার্ট শুরু হলেও দর্শকদের উপস্থিতি ও উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুরের পর থেকেই প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়া হলে সারিবদ্ধভাবে মাঠে প্রবেশ করেন দর্শনার্থীরা। জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পরিবেশিত প্রতিটি গানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে পুরো উদ্যান মুখরিত করে তোলেন তারা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে দর্শকরা উপভোগ করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড ও শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে তরুণ শিল্পী এস এম আবদুল্লাহ ফারাবীর কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘বাংলাদেশের বুকে জুলাই থাকবে জেগে’ গানটি। এরপর একে একে মঞ্চে আসেন শিল্পী খালেদ মুন্না এবং ব্যান্ড দল রেবেল’স, যারা তাদের নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় গান গেয়ে শুনিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। জনপ্রিয় ব্যান্ড লালন তাদের চিরচেনা লোকগান ‘জাত গেল জাত গেল’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ ও ‘ক্ষ্যাপারে’ পরিবেশন করে পুরো মাঠে এক আবেগী আবহ তৈরি করে। এ ছাড়া এসেইস (এএসইআইএস) পরিবেশন করে নজরুলসংগীতের একটি আধুনিক ও নতুন সংস্করণ। পরবর্তী সময়ে দেশের শীর্ষ ব্যান্ড হাইওয়ে, মাইলস, ওয়ারফেজ ও ডিফ্রেন্ট টাচের পরিবেশনায় মেতে ওঠে পুরো উদ্যান। শিল্পীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে হাজারো কণ্ঠ এক হয়ে ধ্বনিত করে জুলাইয়ের স্মৃতির গান।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিসচিব কানিজ মওলা, এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন)। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা নতুন প্রজন্মের মননে স্থায়ীভাবে গেঁথে দিতে সংস্কৃতিই হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিল্প-সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি, তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগ ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মৌলিক গানের প্রতিযোগিতা ‘তোমার গানে জাগবে জুলাই’-এর বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী আব্দুল্লাহ্ আল ফারাবী পান ১ লাখ টাকা, দ্বিতীয় হওয়া মহসিন আহমেদ পান ৭৫ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অধিকারী মো. হাফিজুর রহমান পান ৫০ হাজার টাকার প্রাইজমানি ও সনদ। এ ছাড়া বিশেষ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ১৭ জন প্রতিযোগীর প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা ও সনদ প্রদান করা হয়। দিনব্যাপী এই আয়োজন শেষ হয় তরুণ প্রজন্মের সাম্য ও সম্প্রীতির নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে।
রিপোর্টার নাম: 





















