Hi

০৯:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি: ভারতের নিরাপত্তা কৌশলে কি বড় চ্যালেঞ্জ?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। যদিও একে এখনই ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যায়িত করা নিয়ে সংশয় রয়েছে, তবুও এই তিন দেশের কৌশলগত ঐক্য আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে। সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বিশাল সামরিক শক্তির সমন্বয় এই জোটকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

পাকিস্তান দীর্ঘ সময় ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করে আসছে। ১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে প্রশিক্ষণের কাজে সহায়তা দিয়ে আসছে। নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে সৌদি আরব পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় ধরনের সহায়তা করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তুরস্কের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি পাকিস্তানের অস্ত্রভান্ডারে আরও ব্যাপকভাবে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চুক্তিটিকে দেখার দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর সামরিক গুরুত্ব এখনই অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই, কারণ কোনো অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে এটি গড়ে ওঠেনি। পাকিস্তানের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানির মতে, এটি মূলত একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি, পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। এর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনের মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হতে পারে।

তবে এই জোটের শক্তিগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি ও ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন আধুনিক যুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অপারেশন সিন্দুরের সময় তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং আঙ্কারা পাকিস্তানকে শত শত ড্রোন সরবরাহ করেছে।

তাকশশিলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রামানের মতে, তুরস্কের সামরিক প্রভাবকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। তার ভাষ্যমতে, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা তুরস্ক। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেশটির সামরিক প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করেছে, যা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতের জন্য তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। রিয়াদের সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান—উভয়েরই গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব ভারতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে এবং জ্বালানি থেকে প্রযুক্তি খাতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবে প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয় নাগরিক কর্মরত আছেন।

ভারত সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাজার এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে রিয়াদকে কঠিন কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি চাপ ভারতের সামরিক পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যদি রিয়াদ কোনো সংঘাত দ্রুত থামানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করে।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করার চেষ্টা করছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল গত ছয় মাসে তিনবার সৌদি আরব সফর করেছেন। এসব সফরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতও নীরবে নিজের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে নরেন্দ্র মোদির গ্রিস সফর ছিল চার দশকের মধ্যে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর, যা সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করেছে।

পরবর্তীতে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিসের সঙ্গে মোদির বৈঠক এবং সাইপ্রাস সফর এই সম্পর্ককে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। ভারত-ইউরোপ বাণিজ্য ও যোগাযোগের জন্য প্রস্তাবিত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর (আইএমইসি)-এর ক্ষেত্রেও গ্রিস ও সাইপ্রাস গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

মক্কা চুক্তির মূল লক্ষ্য নিয়ে রহস্য রয়েই গেছে। এটি কি কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে জোট, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা? আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত বৈদেশিক অগ্রাধিকারের কারণে এই জোটের জন্ম হতে পারে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই জোট ইরানবিরোধী হওয়ার চেয়ে ইসরাইলবিরোধী সমীকরণের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হতে পারে, যা ইসরাইলের নিরাপত্তার ওপরও নতুন চাপ তৈরি করবে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, ভবিষ্যতে মিশরও এই জোটে যুক্ত হতে পারে। মিশরের বিশাল সামরিক বাহিনী যুক্ত হলে জোটের শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং তিন দেশের ভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এই জোটের কার্যকারিতা সীমিত রাখতে পারে।

পরিশেষে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনই কোনো বড় যুদ্ধের ইঙ্গিত না দিলেও, এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ভারতের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—এই চুক্তির বিকাশ, তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা এবং সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে সেই দীর্ঘ প্রচেষ্টাই যেন আরো সুসংহত রূপ পেল।

সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিপুল অর্থ।

ন্যাটোর সদস্য দেশটি গত কয়েক বছরে নিজস্ব অস্ত্রশিল্পকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

আর পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অবদান তার বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী—এর পাশাপাশি রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার।

এই পারমাণবিক সক্ষমতাই জোটটিকে অন্য মাত্রার কৌশলগত গুরুত্ব দিতে পারে।

একের ওপর হামলা মানে তিনের ওপর হামলা?

আবার হুথিদের মতো আঞ্চলিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পারমাণবিক সক্ষমতার কোনো বাস্তব প্রাসঙ্গিকতাও নেই।

ইরানও সম্ভাব্য একটি নাম হলেও তিন দেশের কেউই তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যেতে আগ্রহী বলে মনে হয় না।

আরেকটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জোটটির পেছনে ইসরাইলবিরোধী মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তবে পাকিস্তান তার পারমাণবিক প্রযুক্তি বা সক্ষমতার কোনো অংশ মিত্রদের সঙ্গে ভাগ করছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

দেশটি যুক্ত হলে জোটের সামরিক শক্তি যেমন বাড়বে, তেমনি এর ভৌগোলিক পরিসরও ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী ও ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ পডকাস্টের সহ-উপস্থাপক ররি স্টুয়ার্টের মতে, ভারত, ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে ঘিরে একটি সম্ভাব্য পাল্টা সমীকরণ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তি এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

জনপ্রিয়

দালাল চক্রের প্রতারণায় দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার পথে জাম্বিয়ায় ৩ বাংলাদেশির মৃত্যু

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি: ভারতের নিরাপত্তা কৌশলে কি বড় চ্যালেঞ্জ?

আপডেট : ০৭:৪৪:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। যদিও একে এখনই ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যায়িত করা নিয়ে সংশয় রয়েছে, তবুও এই তিন দেশের কৌশলগত ঐক্য আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে। সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বিশাল সামরিক শক্তির সমন্বয় এই জোটকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

পাকিস্তান দীর্ঘ সময় ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করে আসছে। ১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে প্রশিক্ষণের কাজে সহায়তা দিয়ে আসছে। নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে সৌদি আরব পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় ধরনের সহায়তা করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তুরস্কের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি পাকিস্তানের অস্ত্রভান্ডারে আরও ব্যাপকভাবে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চুক্তিটিকে দেখার দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর সামরিক গুরুত্ব এখনই অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই, কারণ কোনো অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে এটি গড়ে ওঠেনি। পাকিস্তানের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানির মতে, এটি মূলত একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি, পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। এর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনের মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হতে পারে।

তবে এই জোটের শক্তিগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি ও ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন আধুনিক যুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অপারেশন সিন্দুরের সময় তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং আঙ্কারা পাকিস্তানকে শত শত ড্রোন সরবরাহ করেছে।

তাকশশিলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রামানের মতে, তুরস্কের সামরিক প্রভাবকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। তার ভাষ্যমতে, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা তুরস্ক। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেশটির সামরিক প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করেছে, যা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতের জন্য তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। রিয়াদের সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান—উভয়েরই গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব ভারতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে এবং জ্বালানি থেকে প্রযুক্তি খাতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবে প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয় নাগরিক কর্মরত আছেন।

ভারত সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাজার এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতে রিয়াদকে কঠিন কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি চাপ ভারতের সামরিক পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যদি রিয়াদ কোনো সংঘাত দ্রুত থামানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করে।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করার চেষ্টা করছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল গত ছয় মাসে তিনবার সৌদি আরব সফর করেছেন। এসব সফরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতও নীরবে নিজের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে নরেন্দ্র মোদির গ্রিস সফর ছিল চার দশকের মধ্যে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর, যা সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করেছে।

পরবর্তীতে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিসের সঙ্গে মোদির বৈঠক এবং সাইপ্রাস সফর এই সম্পর্ককে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। ভারত-ইউরোপ বাণিজ্য ও যোগাযোগের জন্য প্রস্তাবিত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর (আইএমইসি)-এর ক্ষেত্রেও গ্রিস ও সাইপ্রাস গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

মক্কা চুক্তির মূল লক্ষ্য নিয়ে রহস্য রয়েই গেছে। এটি কি কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে জোট, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা? আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত বৈদেশিক অগ্রাধিকারের কারণে এই জোটের জন্ম হতে পারে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই জোট ইরানবিরোধী হওয়ার চেয়ে ইসরাইলবিরোধী সমীকরণের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হতে পারে, যা ইসরাইলের নিরাপত্তার ওপরও নতুন চাপ তৈরি করবে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, ভবিষ্যতে মিশরও এই জোটে যুক্ত হতে পারে। মিশরের বিশাল সামরিক বাহিনী যুক্ত হলে জোটের শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং তিন দেশের ভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এই জোটের কার্যকারিতা সীমিত রাখতে পারে।

পরিশেষে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনই কোনো বড় যুদ্ধের ইঙ্গিত না দিলেও, এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ভারতের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—এই চুক্তির বিকাশ, তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা এবং সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে সেই দীর্ঘ প্রচেষ্টাই যেন আরো সুসংহত রূপ পেল।

সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিপুল অর্থ।

ন্যাটোর সদস্য দেশটি গত কয়েক বছরে নিজস্ব অস্ত্রশিল্পকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

আর পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অবদান তার বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী—এর পাশাপাশি রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার।

এই পারমাণবিক সক্ষমতাই জোটটিকে অন্য মাত্রার কৌশলগত গুরুত্ব দিতে পারে।

একের ওপর হামলা মানে তিনের ওপর হামলা?

আবার হুথিদের মতো আঞ্চলিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পারমাণবিক সক্ষমতার কোনো বাস্তব প্রাসঙ্গিকতাও নেই।

ইরানও সম্ভাব্য একটি নাম হলেও তিন দেশের কেউই তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে যেতে আগ্রহী বলে মনে হয় না।

আরেকটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জোটটির পেছনে ইসরাইলবিরোধী মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তবে পাকিস্তান তার পারমাণবিক প্রযুক্তি বা সক্ষমতার কোনো অংশ মিত্রদের সঙ্গে ভাগ করছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

দেশটি যুক্ত হলে জোটের সামরিক শক্তি যেমন বাড়বে, তেমনি এর ভৌগোলিক পরিসরও ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী ও ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ পডকাস্টের সহ-উপস্থাপক ররি স্টুয়ার্টের মতে, ভারত, ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে ঘিরে একটি সম্ভাব্য পাল্টা সমীকরণ ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তি এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।