Hi

০৮:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ফেরাতে প্রস্তুত মিয়ানমার

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের নয় বছর পূর্তির প্রাক্কালে মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। শনিবার (১৫ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেয়। দেশটির কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাকি ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় সফলভাবে যাচাই করা যায়নি। এছাড়া তালিকায় থাকা ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত বলে দাবি করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত এসব বাসিন্দাকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে চালিয়ে যাবে তারা। তবে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমার দাবি করেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল এবং ২ লাখের বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনে রয়ে গিয়েছিল।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছরের একটি প্রত্যাবাসন কাঠামোতে সম্মত হলেও ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেই উদ্যোগ থমকে যায়। এরপর ২০২৩ সালে রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। বর্তমানে রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি শিবিরে জীবনযাত্রার মান অবনতি ও মানবিক সহায়তায় কাটছাঁট হওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন।

এর আগে জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার তাদের দেশে থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং এপি’কে জানান, ওই কর্মসূচি শুধুমাত্র মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাচাইকৃত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সম্মত হয়েছে—এমন প্রতিবেদন তিনি সে সময় নাকচ করে দিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে থেকেই কয়েক দফা সহিংসতার কারণে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, ২০১৭ সালের ওই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও নৃশংসতা ছিল ভয়াবহ, যার ফলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ ওঠে।

মিয়ানমার, যা আগে বার্মা নামে পরিচিত ছিল, তারা ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসেবেও রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। বরং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে আসছে দেশটি।

কিন্তু ২০২১ সালে দেশটির সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, পরিকল্পনা ও নৃশংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ব্যাপক অভিযোগ তোলে।

এরপর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগগুলো বাস্তবে কার্যকর হয়নি।

অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা এই যুদ্ধে আরও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর জীবনযাত্রার অবনতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট এবং মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা না থাকায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন।

অযোগ্য ও অনিরাপদ নৌযানে করে তারা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছেন।

জনপ্রিয়

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে দুঃখপ্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর, দ্রুত সমাধানের আশ্বাস

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ফেরাতে প্রস্তুত মিয়ানমার

আপডেট : ০৭:২২:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের নয় বছর পূর্তির প্রাক্কালে মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। শনিবার (১৫ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেয়। দেশটির কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাকি ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় সফলভাবে যাচাই করা যায়নি। এছাড়া তালিকায় থাকা ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত বলে দাবি করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত এসব বাসিন্দাকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে চালিয়ে যাবে তারা। তবে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমার দাবি করেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল এবং ২ লাখের বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনে রয়ে গিয়েছিল।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছরের একটি প্রত্যাবাসন কাঠামোতে সম্মত হলেও ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেই উদ্যোগ থমকে যায়। এরপর ২০২৩ সালে রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। বর্তমানে রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি শিবিরে জীবনযাত্রার মান অবনতি ও মানবিক সহায়তায় কাটছাঁট হওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন।

এর আগে জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার তাদের দেশে থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং এপি’কে জানান, ওই কর্মসূচি শুধুমাত্র মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাচাইকৃত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সম্মত হয়েছে—এমন প্রতিবেদন তিনি সে সময় নাকচ করে দিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে থেকেই কয়েক দফা সহিংসতার কারণে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, ২০১৭ সালের ওই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও নৃশংসতা ছিল ভয়াবহ, যার ফলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের অভিযোগ ওঠে।

মিয়ানমার, যা আগে বার্মা নামে পরিচিত ছিল, তারা ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসেবেও রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। বরং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে আসছে দেশটি।

কিন্তু ২০২১ সালে দেশটির সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, পরিকল্পনা ও নৃশংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ব্যাপক অভিযোগ তোলে।

এরপর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগগুলো বাস্তবে কার্যকর হয়নি।

অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা এই যুদ্ধে আরও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর জীবনযাত্রার অবনতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট এবং মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা না থাকায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন।

অযোগ্য ও অনিরাপদ নৌযানে করে তারা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছেন।