Hi

০১:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের নতুন দর-কষাকষি ও মার্কিন অস্বস্তি

  • রিপোর্টার নাম:
  • আপডেট : ১২:০৪:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
  • ২০ জন দেখেছে

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সাত মাসের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নতুন এক পরিকল্পনা সামনে এনেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বাইরে থেকে এটি উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের চাল। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

আরাগচির প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান ও ওমানের যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন নৌ-পথ নির্ধারণের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালী সাত দিনের জন্য খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবটি কেবল নৌ চলাচলের সাধারণ অবস্থায় ফেরার আহ্বান নয়, বরং এটি হরমুজকে একটি নিয়ন্ত্রিত করিডরে পরিণত করার চেষ্টা। বর্তমানে ইরান ওমান ও চীনের সমর্থন নিয়ে এই নতুন কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করবে। তাই এখনই সমাধানের প্রস্তাব দেওয়াই তাদের কাছে বেশি লাভজনক। ইরান যেভাবে যুদ্ধরীতির ধরন বদলে দিল। তবে এমন পৃথক লিখিত নথির অস্তিত্ব নিশ্চিত করার মতো উন্মুক্ত তথ্য নেই।

এই পরিকল্পনার বিনিময়ে ইরান বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আর্থিক ছাড় চায়। আরাগচির তালিকায় রয়েছে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে সাত দিনের যুদ্ধবিরতি, ইরানের ওপর থেকে তেলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানের জব্দ করা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার অর্থ ছাড়ের দাবি। ইরান কার্যত তাদের তৈরি করা চাপকে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি করতে চাইছে। ইরান যে কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে আটকে ফেলতে চাইছে।

ইরানের নীতিতে বরাবরই এক ধরণের ভূমিকা-বিভাজন দেখা যায়, যেখানে এক পক্ষ কঠোর দাবি তোলে এবং অন্য পক্ষ কিছুটা নমনীয় থাকে যাতে সমঝোতার পথ খোলা থাকে। এর আগে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের একদিন আগেই আরাগচি মার্কিন দূতদের কাছে ৬০ দিন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির একটি লিখিত রূপরেখা দিয়েছিলেন। সেই নথিতে ইরান প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার জব্দ অর্থছাড় এবং হুতি বিদ্রোহীদের ওপর আরোপিত অবরোধ শিথিলের দাবি জানিয়েছিল। আর সেই দামের একটি অংশ দিতে হবে ইয়েমেনকে ঘিরে।

এই দর-কষাকষিতে ইয়েমেনকেও জড়িয়েছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ডের ইয়েমেনবিষয়ক মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি এএফপিকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধ করা তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি। যদিও আরাগচির আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনায় এটি কতটা স্পষ্ট, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দামের কারণে ওয়াশিংটনের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে, যা ইরান তাদের অনুকূলে ব্যবহার করতে চায়। তেহরানের হিসাব হলো, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, হরমুজ বন্ধ রাখার খরচ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তত বাড়বে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই দর-কষাকষিতে ইয়েমেনকে যুক্ত করা।

ইরানের বর্তমান কৌশল হলো, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের আগে এখন থেকেই অনুমোদন নেওয়ার দাবি করা এবং যারা তা মানছে না, তাদের লক্ষ্যবস্তু করা। এই কর্মপন্থাটি আন্তর্জাতিক জলপথের প্রচলিত অধিকারের পরিপন্থী। ওয়াশিংটন অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমানে তাদের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ফলে দুই দেশের মধ্যে এই টানাপোড়েন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ কোনো দেশের একার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক নৌ-পথ। সেখানে সামরিক বা বেসামরিক জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইরান ও ওমানের শর্তাধীন নতুন কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক এই জলপথটি একটি নিয়ন্ত্রিত করিডরে পরিণত হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে তেহরান তার কৌশলের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন এ ব্যবস্থাকে ঘিরে এমন একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে, যা পরে বদলানো কঠিন হবে।

জনপ্রিয়
© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের নতুন দর-কষাকষি ও মার্কিন অস্বস্তি

আপডেট : ১২:০৪:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সাত মাসের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নতুন এক পরিকল্পনা সামনে এনেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বাইরে থেকে এটি উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের চাল। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

আরাগচির প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান ও ওমানের যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন নৌ-পথ নির্ধারণের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালী সাত দিনের জন্য খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবটি কেবল নৌ চলাচলের সাধারণ অবস্থায় ফেরার আহ্বান নয়, বরং এটি হরমুজকে একটি নিয়ন্ত্রিত করিডরে পরিণত করার চেষ্টা। বর্তমানে ইরান ওমান ও চীনের সমর্থন নিয়ে এই নতুন কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করবে। তাই এখনই সমাধানের প্রস্তাব দেওয়াই তাদের কাছে বেশি লাভজনক। ইরান যেভাবে যুদ্ধরীতির ধরন বদলে দিল। তবে এমন পৃথক লিখিত নথির অস্তিত্ব নিশ্চিত করার মতো উন্মুক্ত তথ্য নেই।

এই পরিকল্পনার বিনিময়ে ইরান বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আর্থিক ছাড় চায়। আরাগচির তালিকায় রয়েছে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে সাত দিনের যুদ্ধবিরতি, ইরানের ওপর থেকে তেলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানের জব্দ করা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার অর্থ ছাড়ের দাবি। ইরান কার্যত তাদের তৈরি করা চাপকে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি করতে চাইছে। ইরান যে কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে আটকে ফেলতে চাইছে।

ইরানের নীতিতে বরাবরই এক ধরণের ভূমিকা-বিভাজন দেখা যায়, যেখানে এক পক্ষ কঠোর দাবি তোলে এবং অন্য পক্ষ কিছুটা নমনীয় থাকে যাতে সমঝোতার পথ খোলা থাকে। এর আগে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের একদিন আগেই আরাগচি মার্কিন দূতদের কাছে ৬০ দিন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির একটি লিখিত রূপরেখা দিয়েছিলেন। সেই নথিতে ইরান প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার জব্দ অর্থছাড় এবং হুতি বিদ্রোহীদের ওপর আরোপিত অবরোধ শিথিলের দাবি জানিয়েছিল। আর সেই দামের একটি অংশ দিতে হবে ইয়েমেনকে ঘিরে।

এই দর-কষাকষিতে ইয়েমেনকেও জড়িয়েছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ডের ইয়েমেনবিষয়ক মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি এএফপিকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধ করা তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি। যদিও আরাগচির আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনায় এটি কতটা স্পষ্ট, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দামের কারণে ওয়াশিংটনের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে, যা ইরান তাদের অনুকূলে ব্যবহার করতে চায়। তেহরানের হিসাব হলো, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, হরমুজ বন্ধ রাখার খরচ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তত বাড়বে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই দর-কষাকষিতে ইয়েমেনকে যুক্ত করা।

ইরানের বর্তমান কৌশল হলো, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের আগে এখন থেকেই অনুমোদন নেওয়ার দাবি করা এবং যারা তা মানছে না, তাদের লক্ষ্যবস্তু করা। এই কর্মপন্থাটি আন্তর্জাতিক জলপথের প্রচলিত অধিকারের পরিপন্থী। ওয়াশিংটন অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমানে তাদের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ফলে দুই দেশের মধ্যে এই টানাপোড়েন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ কোনো দেশের একার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক নৌ-পথ। সেখানে সামরিক বা বেসামরিক জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইরান ও ওমানের শর্তাধীন নতুন কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক এই জলপথটি একটি নিয়ন্ত্রিত করিডরে পরিণত হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে তেহরান তার কৌশলের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন এ ব্যবস্থাকে ঘিরে এমন একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হতে পারে, যা পরে বদলানো কঠিন হবে।