Hi

১২:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার পথে জাম্বিয়ায় তিন বাংলাদেশির মৃত্যু

উন্নত জীবনের আশায় দক্ষিণ আফ্রিকা পাড়ি দিতে গিয়ে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিন বাংলাদেশি তরুণ। নিহতরা হলেন চাঁদপুর জেলার মতলব থানার বোয়ালিয়াবাড়ির নাজমুল শিপু (২৫), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তালশাহার এলাকার আবেদ মিয়া (২০) এবং চট্টগ্রাম জেলার বাঙ্গালনূরের জোরারগঞ্জের সাইফ উদ্দিন মো. রায়হান (২১)। জাম্বিয়াতে বাংলাদেশি তরুণ সাইফ উদ্দিন মো. রায়হানের (২১) মৃত্যুর সাত দিন পর সোমবার রাত ১টায় তার পিতার কাছে খবর পৌঁছায়। নিহত রায়হান চট্টগ্রাম জেলার বাঙ্গালনূরের জোরারগঞ্জের ৫ নম্বর ওয়ার্ড পশ্চিম দুর্গাপুরের দরবেশ আলী সারেং বাড়ির বাসিন্দা। তার দুই ভাই—সিয়াম উদ্দিন রিহান ও আল আমিন আবির।

নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে সরাসরি ফ্লাইটে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার কথা ছিল তাদের। নাজমুল শিপু ও আবেদ মিয়ার পরিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বাবু ও কামরুজ্জামান দিপু নামের দুই দালালের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। গত সপ্তাহে ঢাকার এক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক পুলকের মাধ্যমে ইথিওপিয়া পর্যন্ত টিকিট কাটা হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দালালরা কথা পাল্টে তাদের সড়কপথে মালাউই ও জাম্বিয়া নিয়ে যায়।

পথিমধ্যে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাদেরকে মানবেতর অবস্থায় আটকে রাখে। সফরসঙ্গীদের ভাষ্যমতে, জাম্বিয়ায় দালাল চক্র ১৫ থেকে ২০ জন মানুষকে একটি রুমে গাদাগাদি করে রাখে। সেখানে তাদের পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বললে তাদের ওপর চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন। নাজমুল শিপু ও আবেদ মিয়া সোমবার (২১ অক্টোবর) মারা গেছেন বলে নবীনগরের সেই দালাল তাদের পরিবারকে নিশ্চিত করেছে। পাঁচজনের জায়গায় ১৫-২০ জন লোককে এক রুমে রেখে দেয়।

অন্যদিকে, নিহত সাইফ উদ্দিন মো. রায়হানের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী জয়নাল আবেদীন ফারুকের ৯ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার সময় তাকে জানানো হয়েছিল আকাশপথে ভ্রমণের কথা। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছে রায়হানসহ ছয় তরুণ জানতে পারেন যে, তাদের দুর্গম সড়কপথ পাড়ি দিতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইথিওপিয়া থেকে মালাউই, জাম্বিয়া ও মোজাম্বিক হয়ে তাদের দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবেশ করার কথা ছিল। কোনোভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাণে ফিরে আসি। এসএসসি ২০২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ভ্রমণকালে ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে রায়হান কঙ্গো সীমান্ত থেকে জাম্বিয়ার পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় নিচে পড়ে যান। সফরসঙ্গীরা জানান, সঙ্গে থাকা স্থানীয় গাইডরা তাকে সহায়তা না করে উল্টো জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, যার ফলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে রায়হান তার পাসপোর্ট ও জুতা তার বাবার কাছে পাঠানোর আকুতি জানিয়ে গিয়েছিলেন।

দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, রায়হানের মৃত্যুর পর দালাল চক্র তার লাশ পাহাড়েই পুঁতে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে রায়হানের পরিবার তার মরদেহ উদ্ধার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও সংকটে পড়েছে। রায়হানের বাবা, যিনি বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে বসবাস করেন, তিনি সন্তানের এই মর্মান্তিক পরিণতির বিচার চেয়েছেন।

নিহতদের পরিবারগুলো এখন সন্তানের শোকে দিশেহারা। তারা দ্রুত লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এই মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের কাছে জরুরি সহযোগিতা চেয়েছেন। এ ছাড়া এই একই পথে যাওয়ার সময় কুমিল্লার চান্দিনার আরিফ হোসেন নামে আরও এক বাংলাদেশি গুরুতর অসুস্থ হয়ে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের পিতামাতা এখন সন্তান হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছেন।

বারবার সতর্ক করার পরও এক শ্রেণির অসাধু আদম ব্যবসায়ী তরুণদের লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এভাবেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দালালদের প্রতারণার কারণে একের পর এক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে আফ্রিকার দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

জনপ্রিয়

পশ্চিমবঙ্গে উপনির্বাচন: পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পর বিধায়ক হুমায়ুন কবির

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার পথে জাম্বিয়ায় তিন বাংলাদেশির মৃত্যু

আপডেট : ০৮:৪৫:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

উন্নত জীবনের আশায় দক্ষিণ আফ্রিকা পাড়ি দিতে গিয়ে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিন বাংলাদেশি তরুণ। নিহতরা হলেন চাঁদপুর জেলার মতলব থানার বোয়ালিয়াবাড়ির নাজমুল শিপু (২৫), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তালশাহার এলাকার আবেদ মিয়া (২০) এবং চট্টগ্রাম জেলার বাঙ্গালনূরের জোরারগঞ্জের সাইফ উদ্দিন মো. রায়হান (২১)। জাম্বিয়াতে বাংলাদেশি তরুণ সাইফ উদ্দিন মো. রায়হানের (২১) মৃত্যুর সাত দিন পর সোমবার রাত ১টায় তার পিতার কাছে খবর পৌঁছায়। নিহত রায়হান চট্টগ্রাম জেলার বাঙ্গালনূরের জোরারগঞ্জের ৫ নম্বর ওয়ার্ড পশ্চিম দুর্গাপুরের দরবেশ আলী সারেং বাড়ির বাসিন্দা। তার দুই ভাই—সিয়াম উদ্দিন রিহান ও আল আমিন আবির।

নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে সরাসরি ফ্লাইটে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার কথা ছিল তাদের। নাজমুল শিপু ও আবেদ মিয়ার পরিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বাবু ও কামরুজ্জামান দিপু নামের দুই দালালের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। গত সপ্তাহে ঢাকার এক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক পুলকের মাধ্যমে ইথিওপিয়া পর্যন্ত টিকিট কাটা হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দালালরা কথা পাল্টে তাদের সড়কপথে মালাউই ও জাম্বিয়া নিয়ে যায়।

পথিমধ্যে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাদেরকে মানবেতর অবস্থায় আটকে রাখে। সফরসঙ্গীদের ভাষ্যমতে, জাম্বিয়ায় দালাল চক্র ১৫ থেকে ২০ জন মানুষকে একটি রুমে গাদাগাদি করে রাখে। সেখানে তাদের পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কথা বললে তাদের ওপর চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন। নাজমুল শিপু ও আবেদ মিয়া সোমবার (২১ অক্টোবর) মারা গেছেন বলে নবীনগরের সেই দালাল তাদের পরিবারকে নিশ্চিত করেছে। পাঁচজনের জায়গায় ১৫-২০ জন লোককে এক রুমে রেখে দেয়।

অন্যদিকে, নিহত সাইফ উদ্দিন মো. রায়হানের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী জয়নাল আবেদীন ফারুকের ৯ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার সময় তাকে জানানো হয়েছিল আকাশপথে ভ্রমণের কথা। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছে রায়হানসহ ছয় তরুণ জানতে পারেন যে, তাদের দুর্গম সড়কপথ পাড়ি দিতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইথিওপিয়া থেকে মালাউই, জাম্বিয়া ও মোজাম্বিক হয়ে তাদের দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবেশ করার কথা ছিল। কোনোভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাণে ফিরে আসি। এসএসসি ২০২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ভ্রমণকালে ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে রায়হান কঙ্গো সীমান্ত থেকে জাম্বিয়ার পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় নিচে পড়ে যান। সফরসঙ্গীরা জানান, সঙ্গে থাকা স্থানীয় গাইডরা তাকে সহায়তা না করে উল্টো জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, যার ফলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে রায়হান তার পাসপোর্ট ও জুতা তার বাবার কাছে পাঠানোর আকুতি জানিয়ে গিয়েছিলেন।

দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, রায়হানের মৃত্যুর পর দালাল চক্র তার লাশ পাহাড়েই পুঁতে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে রায়হানের পরিবার তার মরদেহ উদ্ধার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও সংকটে পড়েছে। রায়হানের বাবা, যিনি বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে বসবাস করেন, তিনি সন্তানের এই মর্মান্তিক পরিণতির বিচার চেয়েছেন।

নিহতদের পরিবারগুলো এখন সন্তানের শোকে দিশেহারা। তারা দ্রুত লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এই মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের কাছে জরুরি সহযোগিতা চেয়েছেন। এ ছাড়া এই একই পথে যাওয়ার সময় কুমিল্লার চান্দিনার আরিফ হোসেন নামে আরও এক বাংলাদেশি গুরুতর অসুস্থ হয়ে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের পিতামাতা এখন সন্তান হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছেন।

বারবার সতর্ক করার পরও এক শ্রেণির অসাধু আদম ব্যবসায়ী তরুণদের লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এভাবেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দালালদের প্রতারণার কারণে একের পর এক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে আফ্রিকার দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।