বিগত সরকারের ১৬ বছরের শাসনকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনেরা গভীর বেদনা ও আকুলতা নিয়ে প্রিয়জনদের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। বুধবার বিকেলে রাজধানী ঢাকার জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য আবৃত্তি উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুম হওয়া সাতশর বেশি মানুষের পরিবার আজও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে পরম করুণাময়ের কাছে তাঁদের স্বজনদের অক্ষত ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করে যাচ্ছেন। এই চিত্র কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি বিগত রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম ও কালো অধ্যায়ের জীবন্ত দলিল।
অনুষ্ঠানে অতীতের শাসনব্যবষ্টার কঠোর সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী বলেন, সুদীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সেই স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারগুলো নির্মমভাবে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমন করার উদ্দেশ্যে প্রায় ৬০ লাখ মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দায়ের করা হয়, যা দেশের বিচারব্যবস্থাকে এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এছাড়া ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে সাড়ে চার হাজারের বেশি নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই ধরনের বিচারবহির্ভূত নৃশংসতা কেবল আইনের শাসনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং সমাজকে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও ভীতির সংস্কৃতির দিকে ধাবিত করেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও নির্বাচিত গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দেন তিনি।
একই অনুষ্ঠানে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের একটি দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের ঘোষণা দেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমান দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর গোচরীভূত হয় যে, দেশের শিল্প-সংস্কৃতির অন্যান্য শাখা যেমন গান ও নাচের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকলেও আবৃত্তি শিল্পটি উপেক্ষিত ছিল। এই বৈষম্য দূর করতে এবং আবৃত্তি শিল্পীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আবৃত্তিকে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বীকৃত শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা এই শিল্প মাধ্যমের বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশনের ভূয়সী প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য হলো একটি বৈষম্যহীন, নির্মল, গণতান্ত্রিক এবং রক্তপাতহীন সমাজ গঠন করা, যেখানে মানুষের মনের সৌন্দর্য বিকশিত হতে পারে। আমরা সবসময়ই এমন একটি সমাজ গড়ার স্বপ্ন লালন করে এসেছি যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এই আবৃত্তি উৎসবে অন্যান্যের মধ্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মসহ বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা এবং দেশের প্রথিতযশা আবৃত্তিশিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি শেষ হয় বৈষম্যবিরোধী ও মানবতার জয়গান গেয়ে বিভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
রিপোর্টার নাম: 





















