Hi

০৭:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এশিয়ার সেরা বিজ্ঞানীর তালিকায় বুটেক্স শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন: টেক্সটাইল শিল্পে টেকসই উদ্ভাবনের জয়রথ

বড় ধরনের আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়াই পোশাকশিল্পে কার্বন নির্গমন এবং পরিবেশদূষণ হ্রাসের অভিনব ও কার্যকরী উপায় আবিষ্কার করে এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় স্থান লাভ করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন শায়ক। স্বনামধন্য বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘এশিয়ান সায়েন্টিস্ট’-এর সাম্প্রতিক প্রকাশনায় এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই দেশের একাডেমিক ও শিল্প মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রশংসার জোয়ার। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বিশ্বমানের গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার এক উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় প্রমাণ।

বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন শায়ক তাঁর এই গবেষণার নেপথ্য গল্প, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, এই স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে তাঁর কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না; বরং তিনি সবসময় বাস্তবধর্মী সমস্যার টেকসই সমাধান খোঁজার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। গত দুই দশকে দেশের শত শত টেক্সটাইল কারখানায় নিবিড়ভাবে কাজ করার সুবাদে তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, অতিরিক্ত পানির ব্যবহার, উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং অদক্ষ উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মতো পরিবেশগত সমস্যাগুলো বারবার ফিরে আসছে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল—শুধু দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করে উৎপাদনপ্রক্রিয়াকেই কীভাবে আরও দক্ষ ও কম কার্বননির্ভর করা যায়।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টেক্সটাইল ও ফ্যাশনশিল্পকে অন্যতম প্রধান দূষণকারী খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কার্বন ও পানির ব্যবহার হ্রাসের কড়া অঙ্গীকারের কারণে বিশ্বব্যাপী পোশাকশিল্পে বড় ধরণের পরিবর্তন আনয়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ড. আব্বাস উদ্দীনের গবেষণা মূলত উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সহজ কথায়, একই কাপড় কীভাবে আরও কম পানি, বিদ্যুৎ, রাসায়নিক এবং কার্বন নিঃসরণে তৈরি করা সম্ভব, সেটিই তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ও দর্শন।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুফল বয়ে আনতে পারে। দেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের বিশাল অবদানের কথা মাথায় রেখে, উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় পানি ও জ্বালানির ব্যবহার সামান্য পরিমাণও কমানো গেলে তার সামগ্রিক প্রভাব হবে বিশাল। বিশ্ব অর্থনীতি যখন ক্রমশ কম কার্বন অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কেবল কম খরচে উৎপাদন নয়, বরং টেকসই ও দক্ষ সবুজ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বলে মনে করেন এই গবেষক।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ড. আব্বাস উদ্দীন জানান, তিনি খুব শীঘ্রই ডিজিটাল টুলস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে টেক্সটাইল ডিকার্বনাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত করতে চান। তাঁর সুদূর প্রসারী লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে টেক্সটাইল ডিকার্বনাইজেশন গবেষণা ও উদ্ভাবনের একটি অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা। দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তাঁর বার্তা খুবই স্পষ্ট—গবেষণায় সফল হতে হলে শুধু মেধা নয়, প্রয়োজন সঠিক মানসিকতা, প্রবল কৌতূহল এবং যেকোনো সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখার সৎসাহস। এসি রুমে বসে গবেষণা না করে প্রয়োজনে কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা অর্জন করার ওপরও জোর দিয়েছেন এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। দিনশেষে মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারা বিজ্ঞানই হলো সবচেয়ে মূল্যবান বিজ্ঞান।

জনপ্রিয়

এশিয়ার সেরা বিজ্ঞানীর তালিকায় বুটেক্স শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন: টেক্সটাইল শিল্পে টেকসই উদ্ভাবনের জয়রথ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

এশিয়ার সেরা বিজ্ঞানীর তালিকায় বুটেক্স শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন: টেক্সটাইল শিল্পে টেকসই উদ্ভাবনের জয়রথ

আপডেট : ০৭:২৩:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

বড় ধরনের আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়াই পোশাকশিল্পে কার্বন নির্গমন এবং পরিবেশদূষণ হ্রাসের অভিনব ও কার্যকরী উপায় আবিষ্কার করে এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় স্থান লাভ করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন শায়ক। স্বনামধন্য বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘এশিয়ান সায়েন্টিস্ট’-এর সাম্প্রতিক প্রকাশনায় এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই দেশের একাডেমিক ও শিল্প মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রশংসার জোয়ার। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বিশ্বমানের গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার এক উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় প্রমাণ।

বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন শায়ক তাঁর এই গবেষণার নেপথ্য গল্প, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, এই স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে তাঁর কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না; বরং তিনি সবসময় বাস্তবধর্মী সমস্যার টেকসই সমাধান খোঁজার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। গত দুই দশকে দেশের শত শত টেক্সটাইল কারখানায় নিবিড়ভাবে কাজ করার সুবাদে তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, অতিরিক্ত পানির ব্যবহার, উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং অদক্ষ উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মতো পরিবেশগত সমস্যাগুলো বারবার ফিরে আসছে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল—শুধু দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করে উৎপাদনপ্রক্রিয়াকেই কীভাবে আরও দক্ষ ও কম কার্বননির্ভর করা যায়।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টেক্সটাইল ও ফ্যাশনশিল্পকে অন্যতম প্রধান দূষণকারী খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কার্বন ও পানির ব্যবহার হ্রাসের কড়া অঙ্গীকারের কারণে বিশ্বব্যাপী পোশাকশিল্পে বড় ধরণের পরিবর্তন আনয়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ড. আব্বাস উদ্দীনের গবেষণা মূলত উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সহজ কথায়, একই কাপড় কীভাবে আরও কম পানি, বিদ্যুৎ, রাসায়নিক এবং কার্বন নিঃসরণে তৈরি করা সম্ভব, সেটিই তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ও দর্শন।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুফল বয়ে আনতে পারে। দেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের বিশাল অবদানের কথা মাথায় রেখে, উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় পানি ও জ্বালানির ব্যবহার সামান্য পরিমাণও কমানো গেলে তার সামগ্রিক প্রভাব হবে বিশাল। বিশ্ব অর্থনীতি যখন ক্রমশ কম কার্বন অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কেবল কম খরচে উৎপাদন নয়, বরং টেকসই ও দক্ষ সবুজ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বলে মনে করেন এই গবেষক।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ড. আব্বাস উদ্দীন জানান, তিনি খুব শীঘ্রই ডিজিটাল টুলস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে টেক্সটাইল ডিকার্বনাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত করতে চান। তাঁর সুদূর প্রসারী লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে টেক্সটাইল ডিকার্বনাইজেশন গবেষণা ও উদ্ভাবনের একটি অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা। দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তাঁর বার্তা খুবই স্পষ্ট—গবেষণায় সফল হতে হলে শুধু মেধা নয়, প্রয়োজন সঠিক মানসিকতা, প্রবল কৌতূহল এবং যেকোনো সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখার সৎসাহস। এসি রুমে বসে গবেষণা না করে প্রয়োজনে কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা অর্জন করার ওপরও জোর দিয়েছেন এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। দিনশেষে মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারা বিজ্ঞানই হলো সবচেয়ে মূল্যবান বিজ্ঞান।