Hi

১২:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকরণে সৌদি আরবকে চাপ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ভুল হবে

ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আরও বাস্তবসম্মত হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের শর্ত জুড়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কৌশলগত ভুল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক আলোচনায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়টিকে ইসরায়েলের সঙ্গে আকস্মিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সঙ্গে একীভূত করতে চায়, তবে তা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিগত লক্ষ্যকে জোর করে মেলানোর শামিল হবে। প্রথম নজরে এতে মার্কিন কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করতে পারে এবং ওই অঞ্চলে বহুমুখী শক্তির উত্থানকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।

সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট নীতির কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিয়াদ বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর পথ উন্মুক্ত হওয়ার পরেই কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছে। ২০০২ সালের ঐতিহাসিক আরব শান্তি উদ্যোগের মূল রূপকার ছিল সৌদি আরব। সেই শান্তি কাঠামোর মূল কথাই ছিল—ইসরায়েল যদি দখলকৃত আরব ভূমি থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মেনে নেয়, তবেই কেবল আরব বিশ্ব তেল আবিবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। বর্তমান গাজা সংকটের চরম পরিস্থিতির মধ্যেও রিয়াদের নীতিনির্ধারকরা বারবার এই পুরোনো ও স্থির অবস্থানেই অনড় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে গত এক দশকে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশটি অর্থনৈতিক সংস্কার, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের সম্পর্ক বহুমুখী করার ওপর জোর দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঐতিহ্যগত মার্কিন প্রভাবের বাইরে গিয়ে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা হয়েছে, এমনকি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী পরিবর্তনের পরেও ফিলিস্তিন সংকটের প্রশ্নে সৌদি আরব তাদের ঐতিহাসিক নীতি থেকে একচুলও সরে আসেনি। রিয়াদের মতে, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত অধিকারের প্রতি জোরালো সমর্থন বজায় রাখাই তাদের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতার মূল চাবিকাঠি।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদির সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত গুরুত্ব অপরিসীম। এ ধরনের চুক্তি কেবল দুই দেশের প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বকেই দৃঢ় করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখতেও সহায়তা করবে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে একাধিপত্যের দিন শেষ হয়ে এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক দাপট, মস্কোর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মাঝারি শক্তির দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে ওয়াশিংটন এখন আর আগের মতো একক নিয়ন্ত্রক নয়।

এমতাবস্থায়, কূটনীতিতে শর্ত আরোপের পুরোনো কৌশল নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্তভিত্তিক কূটনীতি তখনই সফলতা অর্জন করে, যখন সেই শর্তগুলো বাস্তবসম্মত হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের মৌলিক জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। ফিলিস্তিনের অধিকার ও জনমতের তীব্র আবেগকে পাশ কাটিয়ে কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গেলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। সৌদি নেতৃত্ব কখনোই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরোধী নয়, তবে তাদের স্পষ্ট শর্ত হলো—আগে ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায়সংগত ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান, তারপরেই কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক।

পরিশেষে, আট দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি মিত্রতা টিকিয়ে রাখতে হলে ওয়াশিংটনকে অবশ্যই পুরোনো আধিপত্যবাদী মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে অপ্রয়োজনীয় ও কঠিন শর্তের বেড়াজালে না আটকে বরং এটিকে তার নিজস্ব গুরুত্বের আলোকেই মূল্যায়ন করা উচিত। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে জোড়াজুড়ির কূটনীতি চালালে তা কোনো পক্ষকেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে না; বরং তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।

জনপ্রিয়

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষমতা পেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকরণে সৌদি আরবকে চাপ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ভুল হবে

আপডেট : ১০:২৩:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আরও বাস্তবসম্মত হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের শর্ত জুড়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কৌশলগত ভুল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক আলোচনায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়টিকে ইসরায়েলের সঙ্গে আকস্মিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সঙ্গে একীভূত করতে চায়, তবে তা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিগত লক্ষ্যকে জোর করে মেলানোর শামিল হবে। প্রথম নজরে এতে মার্কিন কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করতে পারে এবং ওই অঞ্চলে বহুমুখী শক্তির উত্থানকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।

সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট নীতির কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিয়াদ বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর পথ উন্মুক্ত হওয়ার পরেই কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছে। ২০০২ সালের ঐতিহাসিক আরব শান্তি উদ্যোগের মূল রূপকার ছিল সৌদি আরব। সেই শান্তি কাঠামোর মূল কথাই ছিল—ইসরায়েল যদি দখলকৃত আরব ভূমি থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মেনে নেয়, তবেই কেবল আরব বিশ্ব তেল আবিবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। বর্তমান গাজা সংকটের চরম পরিস্থিতির মধ্যেও রিয়াদের নীতিনির্ধারকরা বারবার এই পুরোনো ও স্থির অবস্থানেই অনড় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে গত এক দশকে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশটি অর্থনৈতিক সংস্কার, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের সম্পর্ক বহুমুখী করার ওপর জোর দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঐতিহ্যগত মার্কিন প্রভাবের বাইরে গিয়ে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা হয়েছে, এমনকি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী পরিবর্তনের পরেও ফিলিস্তিন সংকটের প্রশ্নে সৌদি আরব তাদের ঐতিহাসিক নীতি থেকে একচুলও সরে আসেনি। রিয়াদের মতে, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত অধিকারের প্রতি জোরালো সমর্থন বজায় রাখাই তাদের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতার মূল চাবিকাঠি।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদির সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত গুরুত্ব অপরিসীম। এ ধরনের চুক্তি কেবল দুই দেশের প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বকেই দৃঢ় করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখতেও সহায়তা করবে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে একাধিপত্যের দিন শেষ হয়ে এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক দাপট, মস্কোর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মাঝারি শক্তির দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে ওয়াশিংটন এখন আর আগের মতো একক নিয়ন্ত্রক নয়।

এমতাবস্থায়, কূটনীতিতে শর্ত আরোপের পুরোনো কৌশল নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্তভিত্তিক কূটনীতি তখনই সফলতা অর্জন করে, যখন সেই শর্তগুলো বাস্তবসম্মত হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের মৌলিক জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। ফিলিস্তিনের অধিকার ও জনমতের তীব্র আবেগকে পাশ কাটিয়ে কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গেলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। সৌদি নেতৃত্ব কখনোই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরোধী নয়, তবে তাদের স্পষ্ট শর্ত হলো—আগে ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায়সংগত ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান, তারপরেই কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক।

পরিশেষে, আট দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি মিত্রতা টিকিয়ে রাখতে হলে ওয়াশিংটনকে অবশ্যই পুরোনো আধিপত্যবাদী মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে অপ্রয়োজনীয় ও কঠিন শর্তের বেড়াজালে না আটকে বরং এটিকে তার নিজস্ব গুরুত্বের আলোকেই মূল্যায়ন করা উচিত। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে জোড়াজুড়ির কূটনীতি চালালে তা কোনো পক্ষকেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে না; বরং তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।