Hi

০৯:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগান্তকারী সম্ভাবনা

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত চিত্র হলো সামান্য জ্বর, মাথাব্যথা বা রক্তচাপের মতো সাধারণ সমস্যার জন্যও রোগীরা সরাসরি বড় হাসপাতালগুলোতে ভিড় জমান। এর ফলে একদিকে যেমন মহানগরী ও জেলা সদরগুলোর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে অপ্রয়োজনীয় রোগীর চাপ তৈরি হয়, অন্যদিকে রোগীদের মূল্যবান সময় ও অর্থ অপচয় হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে প্রায় ৮০ শতাংশ স্বাস্থ্যসমস্যা শুরুতেই মোকাবিলা করা সম্ভব। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, দেশের শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই প্রতিরোধভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোটি এখনো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। অধিকাংশ মানুষই অসুস্থ হওয়ার আগে চিকিৎসকের কাছে যান না এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ঝুঁকি মূল্যায়নের সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং নানা ধরনের অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে প্রবর্তিত হয়েছে ‘ইন্টেলিজেন্ট জেনারেল প্র্যাকটিশনার’ বা আইজিপি মডেল, যা প্রযুক্তি এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সুনিপুণ সমন্বয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। এই মানবকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য মডেলের আওতায় প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা এআই-ভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির পয়েন্ট-অব-কেয়ার ডায়াগনস্টিক ডিভাইস এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনা করছেন। প্রতিটি মানুষের জন্য একটি করে ডিজিটাল স্বাস্থ্য অ্যাকাউন্ট তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থ্যতথ্য ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়, যার ফলে কোনো ব্যক্তির উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি থাকলে তা প্রাথমিক অবস্থাতেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, গ্রামাঞ্চলের কোনো গৃহবধূ হয়তো কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করতে পারছেন এবং সময়মতো জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে মারাত্মক জটিলতা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন।

এআই এখানে চিকিৎসকদের কোনো বিকল্প হিসেবে কাজ করছে না, বরং এটি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন বাড়ি বাড়ি যান, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত রোগের ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে রোগীকে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসকের সঙ্গে যুক্ত করা হয় কিংবা স্থানীয় জিপি সেন্টার বা বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করা হয়। এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত একটি সমন্বিত, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের পাশাপাশি শহরাঞ্চলে ‘আলো ক্লিনিক’ ও উত্তরায় ব্র্যাকের অংশীদারত্বে পরিচালিত ‘আমাদের সুস্বাস্থ্য’ উদ্যোগের মতো কেন্দ্রগুলো সফলভাবে কাজ করছে। ইউনিসেফ ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তায় বাস্তবায়িত এই মডেলগুলো ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষকে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে আশাব্যঞ্জক সাফল্য দেখিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর স্বল্প ব্যয় এবং ব্যাপক সেবা পরিধি। সাধারণ জ্বর বা সংক্রামক রোগের পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর পুষ্টি, কিশোর-কিশোরী ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য এবং স্তন ক্যানসারের মতো রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিংও এই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। নামমাত্র খরচে পরিবারভিত্তিক এই সমন্বিত সেবা প্রদান করায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর আর্থিক চাপ অনেকাংশে কমে আসছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন হেলথ’ বা সবুজ স্বাস্থ্যসেবার ধারণাকেও সামনে নিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের অঙ্গীকার এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগের সঙ্গে এই এআই-ভিত্তিক মডেলটি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ কেবল বড় বড় হাসপাতাল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করে। আইজিপি মডেলের সফল বাস্তবায়ন দেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জনপ্রিয়

বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগান্তকারী সম্ভাবনা

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগান্তকারী সম্ভাবনা

আপডেট : ০৯:২২:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত চিত্র হলো সামান্য জ্বর, মাথাব্যথা বা রক্তচাপের মতো সাধারণ সমস্যার জন্যও রোগীরা সরাসরি বড় হাসপাতালগুলোতে ভিড় জমান। এর ফলে একদিকে যেমন মহানগরী ও জেলা সদরগুলোর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে অপ্রয়োজনীয় রোগীর চাপ তৈরি হয়, অন্যদিকে রোগীদের মূল্যবান সময় ও অর্থ অপচয় হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে প্রায় ৮০ শতাংশ স্বাস্থ্যসমস্যা শুরুতেই মোকাবিলা করা সম্ভব। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, দেশের শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই প্রতিরোধভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোটি এখনো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। অধিকাংশ মানুষই অসুস্থ হওয়ার আগে চিকিৎসকের কাছে যান না এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ঝুঁকি মূল্যায়নের সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং নানা ধরনের অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে প্রবর্তিত হয়েছে ‘ইন্টেলিজেন্ট জেনারেল প্র্যাকটিশনার’ বা আইজিপি মডেল, যা প্রযুক্তি এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সুনিপুণ সমন্বয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। এই মানবকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য মডেলের আওতায় প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা এআই-ভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির পয়েন্ট-অব-কেয়ার ডায়াগনস্টিক ডিভাইস এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনা করছেন। প্রতিটি মানুষের জন্য একটি করে ডিজিটাল স্বাস্থ্য অ্যাকাউন্ট তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থ্যতথ্য ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়, যার ফলে কোনো ব্যক্তির উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি থাকলে তা প্রাথমিক অবস্থাতেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, গ্রামাঞ্চলের কোনো গৃহবধূ হয়তো কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করতে পারছেন এবং সময়মতো জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে মারাত্মক জটিলতা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন।

এআই এখানে চিকিৎসকদের কোনো বিকল্প হিসেবে কাজ করছে না, বরং এটি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন বাড়ি বাড়ি যান, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত রোগের ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে রোগীকে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসকের সঙ্গে যুক্ত করা হয় কিংবা স্থানীয় জিপি সেন্টার বা বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করা হয়। এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত একটি সমন্বিত, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের পাশাপাশি শহরাঞ্চলে ‘আলো ক্লিনিক’ ও উত্তরায় ব্র্যাকের অংশীদারত্বে পরিচালিত ‘আমাদের সুস্বাস্থ্য’ উদ্যোগের মতো কেন্দ্রগুলো সফলভাবে কাজ করছে। ইউনিসেফ ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তায় বাস্তবায়িত এই মডেলগুলো ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষকে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে আশাব্যঞ্জক সাফল্য দেখিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর স্বল্প ব্যয় এবং ব্যাপক সেবা পরিধি। সাধারণ জ্বর বা সংক্রামক রোগের পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর পুষ্টি, কিশোর-কিশোরী ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য এবং স্তন ক্যানসারের মতো রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিংও এই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। নামমাত্র খরচে পরিবারভিত্তিক এই সমন্বিত সেবা প্রদান করায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর আর্থিক চাপ অনেকাংশে কমে আসছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন হেলথ’ বা সবুজ স্বাস্থ্যসেবার ধারণাকেও সামনে নিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের অঙ্গীকার এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগের সঙ্গে এই এআই-ভিত্তিক মডেলটি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ কেবল বড় বড় হাসপাতাল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করে। আইজিপি মডেলের সফল বাস্তবায়ন দেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।