২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ পর্দা নামার মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের আরও একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াই এবং নতুন চ্যাম্পিয়নের ট্রফি উদযাপনের আড়ালে রয়ে গেছে এক গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্য। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য প্রদর্শনের মঞ্চ নয়; বরং এটি বহু ক্ষেত্রে বিশ্বরাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং স্বৈরশাসকদের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী আসর থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত ফুটবলের এই রাজনৈতিক যোগসূত্র বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
১৯২০-এর দশকে ফিফা সভাপতি জুলে রিমের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টের লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু ফুটবল গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই বৈশ্বিক আসরের পেছনে সবসময়ই সক্রিয় ছিল ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। বিখ্যাত ফুটবল ঐতিহাসিক ডেভিড গোল্ডব্লাট তাঁর ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকেরা নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং জনরোষের মনোযোগ ভিন্ন দিকে সরাতে বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছেন। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেও বিশ্ববাসীর মনোযোগ যেভাবে ফুটবলের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, তা সেই ঐতিহাসিক ধারারই ধারাবাহিকতা মাত্র।
বিশ্বকাপের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৩০ সালের প্রথম ফাইনালেই বল নিয়ে তৈরি হয়েছিল নজিরবিহীন বিবাদ। আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে উভয় দলই নিজেদের বলে খেলার দাবি তোলায় ফিফা সভাপতি দুই অর্ধে দুটি আলাদা বল ব্যবহারের মধ্যস্থতা করেছিলেন, যা ম্যাচের ফলাফলকেও প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের আসরে ফ্যাসিবাদী ইতালির একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি খেলাকে নিজের রাজনৈতিক প্রচারণার প্রধান মাধ্যম বানিয়েছিলেন। রেফারি কেনাকাটা থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের জীবন বাঁচানোর হুমকি দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সেসময়ের ইতিহাসে। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপেও সামরিক জান্তা জেনারেল ভিদেলার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ংকর চিত্রের পাশেই উদযাপিত হয়েছিল ফুটবলের এই মহোৎসর্গ, যেখানে স্টেডিয়ামের ঠিক পাশেই বন্দীদের নির্যাতন চালানো হতো।
প্রতিটি বিশ্বকাপ যেমন নতুন নতুন রেকর্ডের জন্ম দেয়, তেমনি তা বিশ্ব ইতিহাসের বহু বিতর্কিত অধ্যায়কে উন্মোচন করে। ফুটবলের এই জাদুকরি আকর্ষণ মানুষকে যেমন একত্রিত করে, তেমনই ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো একে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পিছপা হয় না। খেলা ও রাজনীতির এই জটিল সমীকরণ যুগে যুগে প্রমাণিত হয়েছে। তাই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের পর ইতিহাস আমাদের এই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে নিয়ে আসে—বিশ্বকাপ কি সত্যিই শুধু ফুটবলের গল্প, নাকি বিশ্বমঞ্চের এক সুনিপুণ রাজনৈতিক চালচিত্র?
রিপোর্টার নাম: 



















