Hi

০৯:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর বিরলতম গুহামাছের সন্ধান: রহস্যময় ‘ডেমোগর্গন’ প্রজাতির উন্মোচন

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের আলাবামা প্রদেশের গভীরে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৪০ বছর ধরে চলমান গবেষণার ফলস্বরূপ সেখানকার একটি গুহা থেকে সন্ধান মিলেছে পৃথিবীর বিরলতম গুহামাছের এক নতুন প্রজাতির। ফ্যাকাশে বর্ণ, দৃষ্টিশক্তিহীন এবং তুলনামূলকভাবে বৃহৎ আকারের এই মাছটির বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে ‘ডেমোগর্গনইকথিস আরকানাস’। এই আবিষ্কার জীববৈচিত্র্য গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

আলাবামার হান্টসভিলে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটির ভেতরে অবস্থিত ‘ববক্যাট গুহা’ বরাবরই বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশেষ গবেষণাক্ষেত্র। এর আগেও এই গুহায় বিরল প্রজাতির চিংড়িসহ নানা ধরনের প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যে কারণে বিজ্ঞানীরা প্রতি মাসেই এখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে থাকেন। এমন এক নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গবেষণা চালানোর সময় একদল বিজ্ঞানী এই অদ্ভুত ও চোখহীন মাছটির দেখা পান। প্রথম দেখাতেই এটি একটি নতুন প্রজাতি হতে পারে বলে তাঁদের মনে সন্দেহ জাগে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর বিজ্ঞানীরা মাছটির শারীরিক গঠন দেখে আরও নিশ্চিত হন যে এটি অন্যান্য পরিচিত গুহামাছ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ নিমিলা এই আবিষ্কারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, গুহামাছদের বাহ্যিক রূপে প্রায়শই নানা পার্থক্য দেখা যায়, কিন্তু তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য একই হতে পারে। তাই প্রথম দিকে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি। তবে, পরবর্তীকালে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি সত্যিই এক অনন্য নতুন প্রজাতির মাছ। এর পাখনাগুলো অন্যান্য মাছের মতো ছড়ানো নয়, মাথার পেছনে একটি উঁচু অংশ বা কুঁজ রয়েছে এবং মুখের থুতনিটি লম্বা ও চ্যাপটা। কেবল একটি বৈশিষ্ট্য নয়, বরং পুরো শরীর জুড়েই এই স্বতন্ত্র পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট ছিল।

নমুনা সংগ্রহের জন্য পুনরায় গুহায় যাওয়ার আগে গবেষকরা মাছটির ছবি অধ্যাপক জোনাথন আর্মব্রাস্টার এবং পামেলা হার্টের কাছে পাঠান। তাদের বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা আরও নিশ্চিত হন। পরবর্তীতে সিটি স্ক্যান এবং জিনগত গবেষণার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় যে এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর দানব ‘ডেমোগর্গন’-এর নামানুসারে এই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে ডেমোগর্গনইকথিস আরকানাস। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন, নামের শেষ অংশ ‘আরকানাস’ (arkansas) শব্দের অর্থ ‘লুকানো’। চিরকালের অন্ধকারে থাকা এক অচেনা, অন্ধ প্রাণীর জন্য এই নামকরণ অত্যন্ত মানানসই বলে তারা মনে করেন।

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি কেবল একটি নতুন প্রজাতির মাছই নয়, বরং গুহামাছের একটি সম্পূর্ণ নতুন বংশধারার অংশ। অধ্যাপক জোনাথন আর্মব্রাস্টার জোর দিয়ে বলেন, অনেকেই মনে করেন যে গুহার অন্ধ মাছগুলো দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু এই মাছটি প্রমাণ করে যে মাটির নিচের কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তারা নিজেদের শরীরকে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে। তিনি আরও জানান, এই মাছগুলো প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাবার পায় না। তাই মুখে আঁটে এমন যেকোনো ছোট প্রাণীকে এরা অনায়াসে শিকার করে খেয়ে ফেলে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের পৃথিবীর অন্যতম বিশেষ প্রাণীতে পরিণত করেছে।

এই নতুন প্রজাতিটি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গুহা ব্যবস্থা, অর্থাৎ ববক্যাট গুহাতেই পাওয়া গেছে, যা এটিকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশ্বের অন্যতম বিরল মাছে পরিণত করেছে। আশার কথা হলো, এদের আবাসস্থলটি সরকারিভাবে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। অধ্যাপক আর্মব্রাস্টার আরও জানান, এই এলাকাটিতে ‘আলাবামা কেভ শ্রিম্প’ নামে এক বিপন্ন প্রজাতির চিংড়িও রয়েছে, যে কারণে আগে থেকেই সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। এটি নতুন আবিষ্কৃত মাছের সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যদিও কাছের শহরটি ক্রমশ বড় হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানিদূষণের কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তবে এলাকাটি সুরক্ষিত থাকার কারণে এই বিরল গুহামাছগুলো আপাতত নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন। এই গবেষণা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

জনপ্রিয়

বলিউড বনাম দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা: রেষারেষি ও কর্মসংস্কৃতি নিয়ে মুখ খুললেন রাকুল প্রীত সিং

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর বিরলতম গুহামাছের সন্ধান: রহস্যময় ‘ডেমোগর্গন’ প্রজাতির উন্মোচন

আপডেট : ০৭:২২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের আলাবামা প্রদেশের গভীরে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৪০ বছর ধরে চলমান গবেষণার ফলস্বরূপ সেখানকার একটি গুহা থেকে সন্ধান মিলেছে পৃথিবীর বিরলতম গুহামাছের এক নতুন প্রজাতির। ফ্যাকাশে বর্ণ, দৃষ্টিশক্তিহীন এবং তুলনামূলকভাবে বৃহৎ আকারের এই মাছটির বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে ‘ডেমোগর্গনইকথিস আরকানাস’। এই আবিষ্কার জীববৈচিত্র্য গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

আলাবামার হান্টসভিলে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটির ভেতরে অবস্থিত ‘ববক্যাট গুহা’ বরাবরই বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশেষ গবেষণাক্ষেত্র। এর আগেও এই গুহায় বিরল প্রজাতির চিংড়িসহ নানা ধরনের প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যে কারণে বিজ্ঞানীরা প্রতি মাসেই এখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে থাকেন। এমন এক নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গবেষণা চালানোর সময় একদল বিজ্ঞানী এই অদ্ভুত ও চোখহীন মাছটির দেখা পান। প্রথম দেখাতেই এটি একটি নতুন প্রজাতি হতে পারে বলে তাঁদের মনে সন্দেহ জাগে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর বিজ্ঞানীরা মাছটির শারীরিক গঠন দেখে আরও নিশ্চিত হন যে এটি অন্যান্য পরিচিত গুহামাছ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ নিমিলা এই আবিষ্কারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, গুহামাছদের বাহ্যিক রূপে প্রায়শই নানা পার্থক্য দেখা যায়, কিন্তু তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য একই হতে পারে। তাই প্রথম দিকে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি। তবে, পরবর্তীকালে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি সত্যিই এক অনন্য নতুন প্রজাতির মাছ। এর পাখনাগুলো অন্যান্য মাছের মতো ছড়ানো নয়, মাথার পেছনে একটি উঁচু অংশ বা কুঁজ রয়েছে এবং মুখের থুতনিটি লম্বা ও চ্যাপটা। কেবল একটি বৈশিষ্ট্য নয়, বরং পুরো শরীর জুড়েই এই স্বতন্ত্র পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট ছিল।

নমুনা সংগ্রহের জন্য পুনরায় গুহায় যাওয়ার আগে গবেষকরা মাছটির ছবি অধ্যাপক জোনাথন আর্মব্রাস্টার এবং পামেলা হার্টের কাছে পাঠান। তাদের বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা আরও নিশ্চিত হন। পরবর্তীতে সিটি স্ক্যান এবং জিনগত গবেষণার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় যে এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর দানব ‘ডেমোগর্গন’-এর নামানুসারে এই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে ডেমোগর্গনইকথিস আরকানাস। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন, নামের শেষ অংশ ‘আরকানাস’ (arkansas) শব্দের অর্থ ‘লুকানো’। চিরকালের অন্ধকারে থাকা এক অচেনা, অন্ধ প্রাণীর জন্য এই নামকরণ অত্যন্ত মানানসই বলে তারা মনে করেন।

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি কেবল একটি নতুন প্রজাতির মাছই নয়, বরং গুহামাছের একটি সম্পূর্ণ নতুন বংশধারার অংশ। অধ্যাপক জোনাথন আর্মব্রাস্টার জোর দিয়ে বলেন, অনেকেই মনে করেন যে গুহার অন্ধ মাছগুলো দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু এই মাছটি প্রমাণ করে যে মাটির নিচের কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তারা নিজেদের শরীরকে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে। তিনি আরও জানান, এই মাছগুলো প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাবার পায় না। তাই মুখে আঁটে এমন যেকোনো ছোট প্রাণীকে এরা অনায়াসে শিকার করে খেয়ে ফেলে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের পৃথিবীর অন্যতম বিশেষ প্রাণীতে পরিণত করেছে।

এই নতুন প্রজাতিটি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গুহা ব্যবস্থা, অর্থাৎ ববক্যাট গুহাতেই পাওয়া গেছে, যা এটিকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশ্বের অন্যতম বিরল মাছে পরিণত করেছে। আশার কথা হলো, এদের আবাসস্থলটি সরকারিভাবে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। অধ্যাপক আর্মব্রাস্টার আরও জানান, এই এলাকাটিতে ‘আলাবামা কেভ শ্রিম্প’ নামে এক বিপন্ন প্রজাতির চিংড়িও রয়েছে, যে কারণে আগে থেকেই সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। এটি নতুন আবিষ্কৃত মাছের সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যদিও কাছের শহরটি ক্রমশ বড় হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানিদূষণের কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তবে এলাকাটি সুরক্ষিত থাকার কারণে এই বিরল গুহামাছগুলো আপাতত নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন। এই গবেষণা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।