বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর ও কৌশলগত জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালির আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে স্বেচ্ছায় টোল আদায়ের এক অভিনব প্রস্তাব পেশ করেছে ওমান। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর সমর্থনপুষ্ট এই পরিকল্পনা গত শনিবার তেহরানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। রয়টার্সকে দেওয়া আরব উপসাগরীয় একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। ওমানের এই উদ্যোগ মূলত মালাক্কা প্রণালির যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেলের আদলে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর সম্মিলিতভাবে রুটটি পরিচালনা করে এবং সংগৃহীত স্বেচ্ছামূলক টোল নিরাপদ নেভিগেশন, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে ব্যয় করে।
প্রস্তাবিত এই রূপরেখা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ওপর কোনো একক দেশ হিসেবে ইরান তার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বা একতরফা বাধ্যতামূলক টোল আরোপের ক্ষমতা রাখব না। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই প্রাণকেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদী সুস্থিতি বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ওমানের এই পরিকল্পনা সামনে আসার প্রেক্ষাপটে গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওমান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ ও বৈঠক করেন। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং মার্কিন আগ্রাসনের ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা নিরসনে যৌথ কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন আরাগচি।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। চলতি বছরের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে তেহরান এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা অর্জিত হলে প্রণালিটি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি মাসের শুরুর দিকে হরমুজে জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ফের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সেই সমঝোতা ভেস্তে যায়। টানা প্রায় ১৩ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী মার্কিন বিমান হামলার পর গত শুক্রবার তা স্থগিত করা হয়। এইvolatile পরিস্থিতির মাঝেই ওমানের নতুন মধ্যস্থতার খবর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
তবে ওমানের এই কূটনৈতিক প্রয়াসকে সাধুবাদ জানালেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন কাতারস্থ জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওমানের এই প্রস্তাব ইরানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং সাধারণ জনগণের চলমান চরম অর্থনৈতিক দুর্ভোগ লাঘব করতে সহায়ক হতে পারে, কারণ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে দেশটির নাগরিকরা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে থাকা উগ্র কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই ছাড় দিতে সম্মত হবে কি না। ওমানের এই প্রস্তাব এখন তেহরানের নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আঞ্চলিক বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তাদের দরকষাকষির ওপর নির্ভর করছে।
রিপোর্টার নাম: 




















