আমেরিকান জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘সুটস’-এর কাল্পনিক ঘটনার বাস্তব রূপ দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিলেন কেনিয়ার এক যুবক। কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আইনি শিক্ষা বা ল ডিগ্রির সনদ ছাড়াই কেনিয়ার হাইকোর্ট এবং বিচারিক আদালতে দাপটের সঙ্গে মামলা পরিচালনা করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন ব্রায়ান মোয়েন্ডা নামের ওই ব্যক্তি। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ল সোসাইটির ডাটাবেজ হ্যাক করে তিনি এক আইনজীবীর পরিচয় জালিয়াতি করেন এবং একের পর এক আইনি লড়াইয়ে জয়ী হন। তার এই অভাবনীয় কাণ্ড প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রূপকথার মতো ছড়িয়ে পড়লেও পরবর্তীতে এর পেছনের চাঞ্চল্যকর সত্য প্রকাশ পায়।
কেনিয়ার আইন সমাজের (Law Society of Kenya – LSK) তথ্য অনুযায়ী, ব্রায়ান মোয়েন্ডা সম্পূর্ণ ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে নিজেকে একজন বৈধ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি দেশটির ল সোসাইটির পোর্টালে অবৈধভাবে প্রবেশ করে ব্রায়ান মোয়েন্ডা এনটুইগা নামের এক প্রকৃত আইনজীবীর অ্যাকাউন্ট দখল করেন। আসল ওই আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে কর্মরত থাকায় তাঁর আলাদা প্র্যাকটিসিং সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হতো না এবং তাঁর পোর্টাল অ্যাকাউন্টটি নিষ্ক্রিয় পড়েছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া ব্রায়ান অ্যাকাউন্টে থাকা ইমেল ঠিকানা পরিবর্তন করেন, নিজের ছবি যুক্ত করেন এবং বৈধ প্র্যাকটিসিং সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করে বসেন। এভাবে আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলিয়ে তিনি বিচারকদের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সুযোগ পান।
রিপোর্টে প্রকাশ, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বাঘা বাঘা বিচারকদের সামনে ২৬টি মামলা পরিচালনা করে প্রতিটিতেই জয়লাভ করার দাবি করেছিলেন এই ভুয়া আইনজীবী। তাঁর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কৌশল এবং আইনি জ্ঞান দেখে খোদ বিচারকেরাও মুগ্ধ হয়েছিলেন। তবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসল ব্রায়ান যখন নিজের একটি সার্টিফিকেটের প্রয়োজনে পোর্টালে লগইন করতে যান, তখনই পুরো জালিয়াতির বিষয়টি উন্মোচিত হয়। পাসওয়ার্ড ভুল দেখানোর পর তিনি আইটি বিভাগের সহায়তা নেন এবং ধরা পড়ে যায় বিশাল এই সাইবার জালিয়াতি ও প্রতারণা।
কেনিয়ার ল সোসাইটির র্যাপিড অ্যাকশন টিম দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ব্রায়ান মোয়েন্ডাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর সামাজিক মাধ্যমে গুঞ্জন রটে যে, তিনি নিজের মামলা নিজেই পরিচালনা করে আদালতকে বোকা বানিয়ে জামিন পেয়েছেন। তবে এই তথ্যটি সঠিক নয়। আইনি বিপাকে পড়ার পর ব্রায়ান নিজেকে রক্ষা করতে কেনিয়ার জাঁদরেল ও অভিজ্ঞ দুই আইনজীবী—জন খামিনওয়া এবং ড্যানস্টান ওমারিকে নিয়োগ করেন। এই আইনজীবীদ্বয়ের আইনি যুক্তিতর্কের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত দুই হাজার কেনিয়ান শিলিংয়ের বিনিময়ে আদালত থেকে জামিন লাভ করেন তিনি। একইসঙ্গে ল সোসাইটি জানিয়েছে, তাঁর ২৬টি মামলা জেতার দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ বা প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড তাদের কাছে নেই।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা কেনিয়াসহ সারা বিশ্বে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা ও ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কীভাবে একজন সাধারণ ব্যক্তি দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে প্র্যাকটিস চালিয়ে গেলেন, তা নিয়ে চলছে তীব্র আলোচনা। বর্তমানে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্রায়ান মোয়েন্ডার এই ঘটনা অপরাধ জগতের এক অভিনব ও রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে।
রিপোর্টার নাম: 


















