Hi

০৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমুদ্রের দুই হাজার মিটার গভীরেও প্লাস্টিকের থাবা: বিজ্ঞানীদের চাঞ্চল্যকর তথ্য

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন, প্রতিকূল ও দুর্গম পরিবেশেও ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য। সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার মিটার গভীরে বসবাসকারী সামুদ্রিক প্রাণীদের দেহে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরের গভীর তলদেশ থেকে সংগৃহীত শামুক ও ঝিনুকের দেহ পরীক্ষা করে এই বিষাক্ত কণার অস্তিত্ব পান দক্ষিণ কোরিয়ার একদল গবেষক। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত হিসেবে বিবেচিত সমুদ্রের তলদেশের বাস্তুতন্ত্রেও প্লাস্টিক দূষণ পৌঁছে যাওয়া সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ বার্তা বহন করছে।

কোরিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বায়োসায়েন্স অ্যান্ড বায়োটেকনোলজির সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ‘নর্থ ফিজি বেসিন’ এবং ভারত মহাসাগরের ‘সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ান রিজ’ এলাকা থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী ‘ওয়াটার রিসার্চ’-এ প্রকাশিত গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ১২টি সামুদ্রিক জীবের মধ্যে ১১টির শরীরেই ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সংগৃহীত প্রাণীদের প্রায় ৯২ শতাংশই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের শিকার হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত প্রতিটি প্রাণীর দেহে গড়ে ৩.৪২ টুকরা মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান। এর মধ্যে দৈনন্দিন নানা পাত্র ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত পলিস্টাইরিন জাতীয় প্লাস্টিকের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি।

গবেষণার সহ-লেখক ও বিশিষ্ট সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী সে-জু কিম এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সমুদ্রের তলদেশের গভীর হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট অঞ্চলসমূহ একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে অক্ষত ও দূষণমুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, প্লাস্টিক দূষণ এখন সাগরের গভীরতম প্রান্তকেও গ্রাস করে ফেলেছে। গবেষণায় আরও জানা যায়, প্রাণীদের খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে তাদের দেহে প্লাস্টিক জমে থাকার স্থান ভিন্ন হচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে খুঁটে খুঁটে খাবার খাওয়া শামুকের পরিপাকতন্ত্রে এবং পানি ছেঁকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করা ঝিনুকের শরীরে সমানভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া গবেষণায় পাওয়া আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো—প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় ভারত মহাসাগরের তলদেশে বসবাসকারী প্রাণীদের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব অনেক বেশি পাওয়া গেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে তৈরি হওয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম কণা, যা উন্মুক্ত সাগরে ভেসে থাকার পর ধীরে ধীরে তলদেশে জমা হয়। তলদেশের বাস্তুতন্ত্রে এই ক্ষতিকর উপাদানের প্রবেশ সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করছে। গভীর সমুদ্রের প্রাণীরা ভুলবশত এসব ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করায় তাদের শারীরিক গঠন ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকন্তু, সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীর মাধ্যমে এসব প্লাস্টিক পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্য তালিকাতেও ফিরে আসার আশঙ্কাজনক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সমুদ্রের হাজার হাজার মিটার গভীরতা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছেঁকে তুলে আনা বাস্তবে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে সমুদ্রের তলদেশকে দূষণমুক্ত করার কোনো প্রযুক্তিগত সমাধান মানবজাতির কাছে নেই। এই সর্বগ্রাসী সংকট মোকাবিলা করার একমাত্র পথ হলো প্লাস্টিক পণ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা এবং মূল উৎসস্থলেই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্লাস্টিকদূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপে না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

জনপ্রিয়

কমনওয়েলথ গেমস শেষ হতেই উগান্ডা ও পাকিস্তানের একাধিক অ্যাথলেটের রহস্যজনক নিখোঁজ

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

সমুদ্রের দুই হাজার মিটার গভীরেও প্লাস্টিকের থাবা: বিজ্ঞানীদের চাঞ্চল্যকর তথ্য

আপডেট : ০৭:২৩:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন, প্রতিকূল ও দুর্গম পরিবেশেও ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য। সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার মিটার গভীরে বসবাসকারী সামুদ্রিক প্রাণীদের দেহে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরের গভীর তলদেশ থেকে সংগৃহীত শামুক ও ঝিনুকের দেহ পরীক্ষা করে এই বিষাক্ত কণার অস্তিত্ব পান দক্ষিণ কোরিয়ার একদল গবেষক। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত হিসেবে বিবেচিত সমুদ্রের তলদেশের বাস্তুতন্ত্রেও প্লাস্টিক দূষণ পৌঁছে যাওয়া সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ বার্তা বহন করছে।

কোরিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বায়োসায়েন্স অ্যান্ড বায়োটেকনোলজির সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ‘নর্থ ফিজি বেসিন’ এবং ভারত মহাসাগরের ‘সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ান রিজ’ এলাকা থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী ‘ওয়াটার রিসার্চ’-এ প্রকাশিত গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ১২টি সামুদ্রিক জীবের মধ্যে ১১টির শরীরেই ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ সংগৃহীত প্রাণীদের প্রায় ৯২ শতাংশই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের শিকার হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত প্রতিটি প্রাণীর দেহে গড়ে ৩.৪২ টুকরা মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান। এর মধ্যে দৈনন্দিন নানা পাত্র ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত পলিস্টাইরিন জাতীয় প্লাস্টিকের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি।

গবেষণার সহ-লেখক ও বিশিষ্ট সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী সে-জু কিম এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সমুদ্রের তলদেশের গভীর হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট অঞ্চলসমূহ একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে অক্ষত ও দূষণমুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, প্লাস্টিক দূষণ এখন সাগরের গভীরতম প্রান্তকেও গ্রাস করে ফেলেছে। গবেষণায় আরও জানা যায়, প্রাণীদের খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে তাদের দেহে প্লাস্টিক জমে থাকার স্থান ভিন্ন হচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে খুঁটে খুঁটে খাবার খাওয়া শামুকের পরিপাকতন্ত্রে এবং পানি ছেঁকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করা ঝিনুকের শরীরে সমানভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া গবেষণায় পাওয়া আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো—প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় ভারত মহাসাগরের তলদেশে বসবাসকারী প্রাণীদের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব অনেক বেশি পাওয়া গেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে তৈরি হওয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম কণা, যা উন্মুক্ত সাগরে ভেসে থাকার পর ধীরে ধীরে তলদেশে জমা হয়। তলদেশের বাস্তুতন্ত্রে এই ক্ষতিকর উপাদানের প্রবেশ সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করছে। গভীর সমুদ্রের প্রাণীরা ভুলবশত এসব ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করায় তাদের শারীরিক গঠন ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকন্তু, সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীর মাধ্যমে এসব প্লাস্টিক পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্য তালিকাতেও ফিরে আসার আশঙ্কাজনক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সমুদ্রের হাজার হাজার মিটার গভীরতা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছেঁকে তুলে আনা বাস্তবে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে সমুদ্রের তলদেশকে দূষণমুক্ত করার কোনো প্রযুক্তিগত সমাধান মানবজাতির কাছে নেই। এই সর্বগ্রাসী সংকট মোকাবিলা করার একমাত্র পথ হলো প্লাস্টিক পণ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা এবং মূল উৎসস্থলেই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্লাস্টিকদূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপে না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।