Hi

০৪:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাকরির পেছনে না ছুটে ডেইরি খামারে সফল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের তরুণ উদ্যোক্তা ইয়াসিন আরাফাত শিক্ষাজীবনে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করলেও ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন গবাদি পশুপালন ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকে। জাতীয় বস্ত্রপ্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিএসসি সম্পন্ন করার পর চাকরির পেছনে না ছুটে ২০১৮ সালে তিনি পাশের উপজেলা কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামে গড়ে তোলেন ‘বস এগ্রো ফার্ম’। শুরুতে মাত্র চারটি গাভি নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, বর্তমানে তার খামারে গরুর সংখ্যা দেড়শরও বেশি। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫টি গাভি থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। এই দুধ দিয়ে তিনি জগন্নাথপুরে নিজস্ব কারখানায় দই ও ঘি তৈরি করছেন, যা বিএসটিআই-এর অনুমোদন নিয়ে সারা দেশে বাজারজাত করা হচ্ছে। গরুর খামার করে সফল হয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার ইয়াসিন আরাফাত। জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরের ভৈরব বাজার রমজান মিয়ার হাউলি এলাকার ফজলুর রহমানের ছেলে ইয়াসিন আরাফাত। সেই ছোট্ট ফার্মটি এখন দেড়শরও বেশি গরু নিয়ে বিশাল এক ফার্মে পরিণত হয়েছে। যার প্রায় ৭০ শতাংশই তার ফার্মে উৎপন্ন। এরমধ্যে ৩০-৩৫টি দুগ্ধ গাভি আছে। প্রথমে এই দুধগুলো বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি করলেও, বর্তমানে তিনি ভৈরবের জগন্নাথপুর এলাকায় গড়ে তুলেছেন দই ও ঘি তৈরির কারখানা। ব্যাপক সাড়া ফেলেছে তার উৎপাদিত ‘বস’ দই ও ঘি। দেশীয় প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানোর মাধ্যমে পশুগুলো লালিত পালিত হয় বলে তার খামার থেকে পছন্দের পশুটি কিনে নিয়ে যান আশপাশের ক্রেতারা। এতেও তার বেশ একটা লভ্যাংশ থাকে বলে জানান তিনি।

খামারের পাশাপাশি ইয়াসিন প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় শতাধিক পশু মোটাতাজাকরণ করেন। খামারটিতে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেড় একরের পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ, হাঁস ও মুরগি পালন এবং সব ধরনের ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। গরুর গোবর থেকে উৎপাদিত বায়ুগ্যাস ব্যবহার করে তাদের পারিবারিক রান্নার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এই প্ল্যান্ট সম্প্রসারণ করে গ্যাসচালিত জেনারেটর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তার, যাতে খামারের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। সামগ্রিকভাবে তার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। শুধু নিজেই সফল হননি, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন শত শত মানুষের। সংগত কারণেই তার কাজ করার কথা ফাইবার, সুতা, কাপড় এবং পোশাক তৈরির প্রযুক্তির নানা বিষয় নিয়ে। খামারের চারপাশে রোপণ করেছেন কলা, মরিচ, লেবু, আম, জামসহ নানান ফলের গাছ। এসব থেকে আহরিত ফলফলাদি পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন হচ্ছে। বর্তমানে চারটি চুলায় তাদের পারিবারিক রান্নার কাজ শেষ করে অব্যবহৃত অতিরিক্ত গ্যাস ছেড়ে দিতে হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে তিনি এই প্ল্যান্টটি আরো সম্প্রসারিত করে গ্যাস দ্বারা চালিত জেনারেটর তৈরি করবেন। তারা খামারের যত্ন-পরিচর্যা ছাড়াও দই, ঘি তৈরি ও প্যাকেজিং কাজ করে থাকেন। আবেগ দিয়ে, মায়া দিয়ে কাজ করতে হবে। যারা এই সেক্টরে আসতে চায়, তারা যেন এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসেন।

তরুণ এই শিল্প উদ্যোক্তার মতে, যেকোনো পেশায় সফল হওয়ার জন্য কেবল অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাজের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দক্ষতা। তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীলতা না থাকলে এই খাতে আসা উচিত নয়। নিজের খামারকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গিয়ে মানসম্মত পণ্য সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ইয়াসিন আরাফাতের এই সফলতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহীনুল হক। তিনি জানান, একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণের এমন উদ্যোগ দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি বড় দৃষ্টান্ত। এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চাইলে যেকোনো সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাবে। তিনি খামারকে একটি সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এখানে কেউ আসতে চাইলে এই সেক্টরকে ভালোবাসতে হবে।

ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মনোয়ারা পারভীন বলেন, সুষম খাদ্য হিসেবে দুধ, ডিম ও মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। ইয়াসিন আরাফাত নিজের কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা কাজে লাগিয়ে শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করেননি, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও প্রথাগত পেশার বাইরে গিয়ে তার এই সফলতা তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। আর এই ভিন্ন পেশায় গিয়েও সফলতা পেয়েছে দারুণভাবে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মঈন খানকে দেখতে গেলেন রাষ্ট্রপতি

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

চাকরির পেছনে না ছুটে ডেইরি খামারে সফল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার

আপডেট : ০৩:৪১:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের তরুণ উদ্যোক্তা ইয়াসিন আরাফাত শিক্ষাজীবনে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করলেও ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন গবাদি পশুপালন ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকে। জাতীয় বস্ত্রপ্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিএসসি সম্পন্ন করার পর চাকরির পেছনে না ছুটে ২০১৮ সালে তিনি পাশের উপজেলা কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামে গড়ে তোলেন ‘বস এগ্রো ফার্ম’। শুরুতে মাত্র চারটি গাভি নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, বর্তমানে তার খামারে গরুর সংখ্যা দেড়শরও বেশি। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫টি গাভি থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। এই দুধ দিয়ে তিনি জগন্নাথপুরে নিজস্ব কারখানায় দই ও ঘি তৈরি করছেন, যা বিএসটিআই-এর অনুমোদন নিয়ে সারা দেশে বাজারজাত করা হচ্ছে। গরুর খামার করে সফল হয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার ইয়াসিন আরাফাত। জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরের ভৈরব বাজার রমজান মিয়ার হাউলি এলাকার ফজলুর রহমানের ছেলে ইয়াসিন আরাফাত। সেই ছোট্ট ফার্মটি এখন দেড়শরও বেশি গরু নিয়ে বিশাল এক ফার্মে পরিণত হয়েছে। যার প্রায় ৭০ শতাংশই তার ফার্মে উৎপন্ন। এরমধ্যে ৩০-৩৫টি দুগ্ধ গাভি আছে। প্রথমে এই দুধগুলো বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি করলেও, বর্তমানে তিনি ভৈরবের জগন্নাথপুর এলাকায় গড়ে তুলেছেন দই ও ঘি তৈরির কারখানা। ব্যাপক সাড়া ফেলেছে তার উৎপাদিত ‘বস’ দই ও ঘি। দেশীয় প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানোর মাধ্যমে পশুগুলো লালিত পালিত হয় বলে তার খামার থেকে পছন্দের পশুটি কিনে নিয়ে যান আশপাশের ক্রেতারা। এতেও তার বেশ একটা লভ্যাংশ থাকে বলে জানান তিনি।

খামারের পাশাপাশি ইয়াসিন প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় শতাধিক পশু মোটাতাজাকরণ করেন। খামারটিতে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেড় একরের পুকুরে মিশ্র মাছ চাষ, হাঁস ও মুরগি পালন এবং সব ধরনের ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। গরুর গোবর থেকে উৎপাদিত বায়ুগ্যাস ব্যবহার করে তাদের পারিবারিক রান্নার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এই প্ল্যান্ট সম্প্রসারণ করে গ্যাসচালিত জেনারেটর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তার, যাতে খামারের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। সামগ্রিকভাবে তার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। শুধু নিজেই সফল হননি, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন শত শত মানুষের। সংগত কারণেই তার কাজ করার কথা ফাইবার, সুতা, কাপড় এবং পোশাক তৈরির প্রযুক্তির নানা বিষয় নিয়ে। খামারের চারপাশে রোপণ করেছেন কলা, মরিচ, লেবু, আম, জামসহ নানান ফলের গাছ। এসব থেকে আহরিত ফলফলাদি পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন হচ্ছে। বর্তমানে চারটি চুলায় তাদের পারিবারিক রান্নার কাজ শেষ করে অব্যবহৃত অতিরিক্ত গ্যাস ছেড়ে দিতে হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে তিনি এই প্ল্যান্টটি আরো সম্প্রসারিত করে গ্যাস দ্বারা চালিত জেনারেটর তৈরি করবেন। তারা খামারের যত্ন-পরিচর্যা ছাড়াও দই, ঘি তৈরি ও প্যাকেজিং কাজ করে থাকেন। আবেগ দিয়ে, মায়া দিয়ে কাজ করতে হবে। যারা এই সেক্টরে আসতে চায়, তারা যেন এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসেন।

তরুণ এই শিল্প উদ্যোক্তার মতে, যেকোনো পেশায় সফল হওয়ার জন্য কেবল অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাজের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দক্ষতা। তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীলতা না থাকলে এই খাতে আসা উচিত নয়। নিজের খামারকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গিয়ে মানসম্মত পণ্য সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ইয়াসিন আরাফাতের এই সফলতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহীনুল হক। তিনি জানান, একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণের এমন উদ্যোগ দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য একটি বড় দৃষ্টান্ত। এ ধরনের উদ্যোগ নিতে চাইলে যেকোনো সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাবে। তিনি খামারকে একটি সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এখানে কেউ আসতে চাইলে এই সেক্টরকে ভালোবাসতে হবে।

ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মনোয়ারা পারভীন বলেন, সুষম খাদ্য হিসেবে দুধ, ডিম ও মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। ইয়াসিন আরাফাত নিজের কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা কাজে লাগিয়ে শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করেননি, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও প্রথাগত পেশার বাইরে গিয়ে তার এই সফলতা তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। আর এই ভিন্ন পেশায় গিয়েও সফলতা পেয়েছে দারুণভাবে।