Hi

০৩:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তরাঞ্চলে গ্যাস মজুত রেখেও বিক্রি বন্ধ, বিপাকে চালক-যাত্রীরা

উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় গত চার দিন ধরে এলপিজি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন পাম্প মালিকরা। পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা আদায়ের পাঁয়তারা করছেন মালিকরা। এই হটকারী সিদ্ধান্তের ফলে এলপিজি চালিত মোটরযান মালিক ও ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের কয়েক শতাধিক পাম্পে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক পাম্পে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত দেখানো হচ্ছে। তারা আর বলেন, কোন কোন পাম্পে এলপিজি গ্যাস মজুত রয়েছে আমরা জেনেশুনে খোঁজ নিয়ে সেখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরেও আমাদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। রাতের বেলা আমাদেরকে বলা হয়েছে পাম্পে এলপিজি নেই গ্রাহক আসলে আমরা সেটাই বলতেছি।

দিনাজপুর দশ মাইল এলাকার এলপিজি পাম্পের প্রতিবেশী দোকানদারদের ভাষ্যমতে, সংকটের কথা জানানোর ঠিক আগের দিনই পাম্পগুলোতে গ্যাসের গাড়ি থেকে সরবরাহ দেওয়া হয়েছিল। দশ মাইল থেকে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়গামী হাইওয়ে সড়কের সব পাম্পেই পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে, যা প্রশাসন তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। দোকানদারদের দাবি, জনগণের পকেট কেটে ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে মালিকরা এই কৌশল অবলম্বন করছেন। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলে এই সংকট তৈরি হতো না বলে তারা মনে করেন। মূলত তারা বাড়তি দামের আশায় সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পায়তারায় লিপ্ত।

লালমনিরহাট কাকিনা গ্যাস পাম্পের এক কর্মচারী জানান, পাম্পে গ্যাস থাকলেও মালিকের নির্দেশেই বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় গ্যাসের দামও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আর দাম বাড়লে বাড়তি আয়ের আশায় এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। একই সুর শোনা গেছে গোবিন্দগঞ্জের এলপিজি পাম্প কর্মচারী মুরশিদুল ইসলামের কণ্ঠে। তিনি জানান, মালিকের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই, তাই গ্রাহক এলে গ্যাস নেই বলে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর এলাকার পাম্প কর্মচারী মুশফিক ও সোহাগ মিয়া জানান, তাদের আশেপাশের পাঁচ-ছয়টি পাম্পে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ আছে। কিন্তু মালিক যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই তাদেরকে চলতে হচ্ছে। এদিকে গাড়ি চালক মিজান, মিলন, সাজু ও মোজাফফরের অভিযোগ, গত চার দিন ধরে গ্যাস না পাওয়ায় তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। তেলের দাম বেশি হওয়ায় তারা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, অথচ পাম্পগুলো গ্যাস থাকা সত্ত্বেও দিচ্ছে না। কোথাও কোথাও তারা খোঁজ নিয়ে গ্যাস পাওয়া সত্ত্বেও পাম্প মালিকরা মেশিন নষ্টের অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মিঠাপুকুর হাসনা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জগদীশ জানান, তাদের পেট্রোল ও ডিজেল থাকলেও মেশিন নষ্টের কারণে এলপিজি দিতে পারছেন না। তবে কেন হঠাৎ এলপিজি বিক্রির সময় সব পাম্পের মেশিন নষ্ট হলো, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। বিসমিল্লাহ এলপিজি গ্যাস পাম্পের ম্যানেজার রায়হান কবির জানান, এলপিজি গ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ৪৩ টাকা থেকে ধাপে ধাপে বেড়ে ৮৯ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে তা কমে বর্তমানে ৭৩ টাকা ০৯ পয়সায় নেমেছে। তাদের মতে, বর্তমানে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। যেদিন সবাই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করল সেদিনই আপনাদেরও মেশিন নষ্ট হলো এমন প্রশ্ন করা হলে ম্যানেজার সঠিক জবাব না দিয়ে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বিসমিল্লাহ এলপিজি গ্যাস পাম্পের ম্যানেজার রায়হান কবির বলেন, আমরা যখন এলপিজি গ্যাস পাম্প চালু করি তখন গ্যাস লিটার ছিল ৪৩ টাকা।

রংপুর জেলা জজ কোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট আখতারা ওসমানী অভিযোগ করেন, পাম্প মালিকরা একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

বদরগঞ্জের মন্ডলের হাট পাম্পের মালিক আব্দুল ওয়াহেদ অবশ্য দায় চাপিয়েছেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর। তিনি জানান, ফ্রেশ, বেক্সিমকো ও যমুনাসহ বড় কোম্পানিগুলো নিজেরাই পাম্প পরিচালনা করছে এবং সাধারণ পাম্প মালিকদের গ্যাস সরবরাহ করছে না। তাদের ভাষ্যমতে, সরকার দ্রুত গ্যাসের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে—এমন প্রলোভন দেখিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।

রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু বলেন, গ্যাস মজুত রেখে সরবরাহ বন্ধ রাখা সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের চক্রান্ত। তিনি প্রশাসনকে সিন্ডিকেট শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পাম্পে গ্যাস থাকা সত্ত্বেও যারা সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো চক্র যাতে জনগণকে জিম্মি করে ফায়দা লুটতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রশাসন বদ্ধপরিকর বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জনপ্রিয়

ফেনীতে দেশের প্রথম সরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

© All rights reserved © Dikdarshon.net
কারিগরি সহযোগিতায়ঃ দিকদর্শন

উত্তরাঞ্চলে গ্যাস মজুত রেখেও বিক্রি বন্ধ, বিপাকে চালক-যাত্রীরা

আপডেট : ০২:১৪:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় গত চার দিন ধরে এলপিজি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন পাম্প মালিকরা। পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা আদায়ের পাঁয়তারা করছেন মালিকরা। এই হটকারী সিদ্ধান্তের ফলে এলপিজি চালিত মোটরযান মালিক ও ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের কয়েক শতাধিক পাম্পে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক পাম্পে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত দেখানো হচ্ছে। তারা আর বলেন, কোন কোন পাম্পে এলপিজি গ্যাস মজুত রয়েছে আমরা জেনেশুনে খোঁজ নিয়ে সেখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরেও আমাদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। রাতের বেলা আমাদেরকে বলা হয়েছে পাম্পে এলপিজি নেই গ্রাহক আসলে আমরা সেটাই বলতেছি।

দিনাজপুর দশ মাইল এলাকার এলপিজি পাম্পের প্রতিবেশী দোকানদারদের ভাষ্যমতে, সংকটের কথা জানানোর ঠিক আগের দিনই পাম্পগুলোতে গ্যাসের গাড়ি থেকে সরবরাহ দেওয়া হয়েছিল। দশ মাইল থেকে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়গামী হাইওয়ে সড়কের সব পাম্পেই পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে, যা প্রশাসন তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। দোকানদারদের দাবি, জনগণের পকেট কেটে ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে মালিকরা এই কৌশল অবলম্বন করছেন। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলে এই সংকট তৈরি হতো না বলে তারা মনে করেন। মূলত তারা বাড়তি দামের আশায় সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পায়তারায় লিপ্ত।

লালমনিরহাট কাকিনা গ্যাস পাম্পের এক কর্মচারী জানান, পাম্পে গ্যাস থাকলেও মালিকের নির্দেশেই বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় গ্যাসের দামও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আর দাম বাড়লে বাড়তি আয়ের আশায় এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। একই সুর শোনা গেছে গোবিন্দগঞ্জের এলপিজি পাম্প কর্মচারী মুরশিদুল ইসলামের কণ্ঠে। তিনি জানান, মালিকের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই, তাই গ্রাহক এলে গ্যাস নেই বলে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর এলাকার পাম্প কর্মচারী মুশফিক ও সোহাগ মিয়া জানান, তাদের আশেপাশের পাঁচ-ছয়টি পাম্পে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ আছে। কিন্তু মালিক যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই তাদেরকে চলতে হচ্ছে। এদিকে গাড়ি চালক মিজান, মিলন, সাজু ও মোজাফফরের অভিযোগ, গত চার দিন ধরে গ্যাস না পাওয়ায় তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। তেলের দাম বেশি হওয়ায় তারা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, অথচ পাম্পগুলো গ্যাস থাকা সত্ত্বেও দিচ্ছে না। কোথাও কোথাও তারা খোঁজ নিয়ে গ্যাস পাওয়া সত্ত্বেও পাম্প মালিকরা মেশিন নষ্টের অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মিঠাপুকুর হাসনা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জগদীশ জানান, তাদের পেট্রোল ও ডিজেল থাকলেও মেশিন নষ্টের কারণে এলপিজি দিতে পারছেন না। তবে কেন হঠাৎ এলপিজি বিক্রির সময় সব পাম্পের মেশিন নষ্ট হলো, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। বিসমিল্লাহ এলপিজি গ্যাস পাম্পের ম্যানেজার রায়হান কবির জানান, এলপিজি গ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ৪৩ টাকা থেকে ধাপে ধাপে বেড়ে ৮৯ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে তা কমে বর্তমানে ৭৩ টাকা ০৯ পয়সায় নেমেছে। তাদের মতে, বর্তমানে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। যেদিন সবাই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করল সেদিনই আপনাদেরও মেশিন নষ্ট হলো এমন প্রশ্ন করা হলে ম্যানেজার সঠিক জবাব না দিয়ে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বিসমিল্লাহ এলপিজি গ্যাস পাম্পের ম্যানেজার রায়হান কবির বলেন, আমরা যখন এলপিজি গ্যাস পাম্প চালু করি তখন গ্যাস লিটার ছিল ৪৩ টাকা।

রংপুর জেলা জজ কোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট আখতারা ওসমানী অভিযোগ করেন, পাম্প মালিকরা একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

বদরগঞ্জের মন্ডলের হাট পাম্পের মালিক আব্দুল ওয়াহেদ অবশ্য দায় চাপিয়েছেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর। তিনি জানান, ফ্রেশ, বেক্সিমকো ও যমুনাসহ বড় কোম্পানিগুলো নিজেরাই পাম্প পরিচালনা করছে এবং সাধারণ পাম্প মালিকদের গ্যাস সরবরাহ করছে না। তাদের ভাষ্যমতে, সরকার দ্রুত গ্যাসের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে—এমন প্রলোভন দেখিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।

রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু বলেন, গ্যাস মজুত রেখে সরবরাহ বন্ধ রাখা সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের চক্রান্ত। তিনি প্রশাসনকে সিন্ডিকেট শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পাম্পে গ্যাস থাকা সত্ত্বেও যারা সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো চক্র যাতে জনগণকে জিম্মি করে ফায়দা লুটতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রশাসন বদ্ধপরিকর বলে তিনি মন্তব্য করেন।